প্রশ্ন: কখন আরজি এবং লিখিত জবাব সংশোধন করার আবেদন করা যায়? কী কী কারণে উক্ত আবেদন মঞ্জুর বা না-মঞ্জুর করা যায়? সংশ্লিষ্ট বিধানসমূহের আলোকে আলোচনা করুন। ‘তামাদি (Limitation) দ্বারা অর্জিত অধিকার’ ন্সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করুন।
উত্তর: The Code of Civil Procedure, 1908-এর Order
VI, Rule 17 অনুযায়ী আদালত মামলার যে কোনো পর্যায়ে যে কোনো পক্ষকে তার প্লিডিংস
(আরজি বা লিখিত জবাব) ন্যায়সঙ্গতভাবে পরিবর্তন বা সংশোধনের অনুমতি দিতে পারেন, যদি
তা পক্ষদ্বয়ের মধ্যকার প্রকৃত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় হয়। এই বিধানের
সাথে সংশ্লিষ্ট সিভিল প্রসিডিউর কোডের ধারা ১৫৩-ও উল্লেখযোগ্য, যা আদালতকে যে কোনো
ত্রুটি সংশোধনের সাধারণ ক্ষমতা দেয়।
মূল নীতিগত ভিত্তি (Foundational Authority)
বাংলাদেশ ও উপমহাদেশের আদালতসমূহ সংশোধন সংক্রান্ত
সিদ্ধান্তে ধারাবাহিকভাবে যে দুটি প্রতিষ্ঠাতুল্য মামলার নীতি অনুসরণ করে, তা হলো:
- Ma Shwe Mya v. Maung Mo Hnaung, AIR 1922 PC 249 প্রিভি কাউন্সিল এই মামলায় বলে, আদালতের বিধিমালা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার একটি হাতিয়ার মাত্র; তাই সংশোধনের ক্ষমতা উদারভাবে প্রয়োগ করা উচিত, তবে শর্ত থাকে যে এর মাধ্যমে একটি cause of action-কে সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেকটি cause of action দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যাবে না।
- Cropper v. Smith, [1884] 29 Ch D 700 এই মামলায় প্রতিষ্ঠিত হয় যে সংশোধনের উদ্দেশ্য পক্ষদের প্রকৃত অধিকার রক্ষা করা, তাদের অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য শাস্তি দেওয়া নয়। যত দূর সম্ভব খরচ (costs) দিয়ে ক্ষতিপূরণ করা গেলে সংশোধন প্রত্যাখ্যান করা উচিত নয়।
কখন আরজি-জবাব সংশোধন করা যায়
বিচারিক আদালতের রায় ঘোষণার আগে, বিচার চলাকালীন, রায় ঘোষণার পরে, এমনকি আপিল, রিভিশন বা আপিলেট ডিভিশন পর্যায়েও এবং প্রয়োজনে জারি (execution) কার্যক্রমেও সংশোধনের আবেদন করা যায়। মামলার কোনো নির্দিষ্ট পর্যায়ে সংশোধনের আবেদন একেবারে নিষিদ্ধ, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা আইনে নেই। তবে যত পরে আবেদন করা হয়, ততই আদালত সতর্কতার সাথে বিবেচনা করেন। কখন আরজি জবাব সংশোধন করা যায় ছকের মাধ্যমে তা তুলে ধরা হলো-
|
পর্যায় |
মামলা ও সাইটেশন |
নীতি |
|
রায় ঘোষণার পরেও |
গোলাম হাফেজ মিয়া বনাম
খাদেম আলী মেঞা, ২৯ ডিএলআর (এসসি) ৩১১ (১৯৭৭) |
বিচারিক আদালত রায় ঘোষণার
পরও প্লিডিংস সংশোধন করতে পারেন, যদি তা অপর পক্ষের ক্ষতির কারণ না হয় |
|
বিচারের যে কোনো পর্যায়ে
বা আপিল ্বা রিভিশন |
কাজল দাস বনাম মনোয়ারা,
৬ বিএলসি ৪১৪ |
বিচারের পূর্বে, বিচারকালে,
বিচারের পরে, আপিলে বা রিভিশনে সংশোধন করা যায় |
|
আপিলেট ডিভিশন বা জারি
কার্যক্রম |
গুরু মিয়া বনাম শামসুল
ইসলাম, ৯ এমএলআর |
আপিলেট ডিভিশনে এমনকি জারি
কার্যক্রমেও সংশোধন সম্ভব |
|
প্রিলিমিনারি ডিক্রির পরেও
(বাটোয়ারা মামলা) |
হানিফ আলী (মোঃ) বনাম হাজেরা
খাতুন ও অন্যান্য, ৫৫ ডিএলআর ১৭ (২০০৩) |
বাটোয়ারা মামলা চূড়ান্ত
ডিক্রি না হওয়া পর্যন্ত বিচারাধীন থাকে; প্রিলিমিনারি ডিক্রির পরেও আরজি সংশোধন
করা যায় |
সংশোধনের আবেদন মঞ্জুরের শর্তাবলি
- প্রস্তাবিত সংশোধনটি মামলার প্রকৃত বিরোধ নির্ণয়ে আবশ্যক হতে হবে।
- সংশোধনটি অপর পক্ষের এমন ক্ষতির কারণ হবে না যা খরচ (costs) দ্বারা পূরণ করা যায় না।
- সংশোধনের ফলে বিবাদী পক্ষের অনুকূলে অর্জিত কোনো আইনগত অধিকার নষ্ট হবে না।
- সংশোধনের ফলে মামলার মূল প্রকৃতি ও চরিত্র পরিবর্তিত হবে না অর্থাৎ এক cause of action-কে সম্পূর্ণ ভিন্ন cause of action দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যাবে না (Ma Shwe Mya নীতি)।
- সংশোধনের ফলে নতুন ও অসামঞ্জস্য মামলার অবতারণা হবে না।
- আবেদনটি সরল বিশ্বাসে (bona fide) আনীত হতে হবে, বিলম্ব ঘটানোর উদ্দেশ্যে নয়।
সংশোধনের আবেদন না-মঞ্জুরের কারণ
- সংশোধনের জন্য আবেদনকারীর অসৎ উদ্দেশ্য (mala fide) থাকলে।
- মামলার প্রকৃত কারণ বা প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়ে গেলে।
- ন্যায়বিচার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে।
- সংশোধন গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত না হলে।
- অত্যধিক বিলম্বে সংশোধনের আবেদন করা হলে।
- সংশোধনের ফলে যদি বিবাদী পক্ষের অনুকূলে Limitation Act-এর মাধ্যমে ইতিমধ্যে অর্জিত (vested) কোনো অধিকার বিশেষত তামাদি আইনের সুরক্ষা কেড়ে নেওয়া হয়, তবে তা সাধারণত অনুমোদিত হয় না
তামাদি (Limitation) দ্বারা অর্জিত অধিকার
এই গ্রাউন্ডটি না-মঞ্জুরের অন্যান্য সাধারণ কারণ
(বিলম্ব, অসৎ উদ্দেশ্য, মামলার চরিত্র পরিবর্তন) থেকে স্বতন্ত্র ও সুনির্দিষ্ট বলে
আলাদাভাবে বিশদ আলোচনার দাবি রাখে।
মূলনীতি
যদি প্রস্তাবিত সংশোধন গ্রহণ করলে তা বিবাদী পক্ষের অনুকূলে ইতিমধ্যে সীমাবদ্ধতা আইন দ্বারা অর্জিত (accrued/vested) কোনো আইনগত অধিকার — অর্থাৎ তামাদির সুরক্ষা কেড়ে নেয়, তবে সেই সংশোধন সাধারণত অনুমোদিত হয় না। এর কারণ হলো Order VI Rule 17-এর অধীনে অনুমোদিত সংশোধন 'relation back doctrine' অনুসারে মূল মামলা দায়েরের তারিখ থেকেই কার্যকর ধরা হয় ।ফলে নতুন দাবিটি সংশোধনের তারিখে তামাদি-বারিত হয়ে থাকলেও, সংশোধন মঞ্জুর হলে তা মূল দায়েরের তারিখে নতুন জীবন পেয়ে যায়, যা বিবাদীর ইতিমধ্যে অর্জিত তামাদির সুরক্ষাকে অন্যায়ভাবে নস্যাৎ করে।
ইংরেজি মূল নীতি —
Weldon v. Neal
এই নিয়মের ঐতিহাসিক উৎস Weldon v. Neal,
(1887) 19 QBD 394 মামলা, যেখানে বলা হয় 'আদালত এমন কোনো সংশোধনের অনুমতি দেবেন না
যার ফলে বিবাদী তার ইতিমধ্যে অর্জিত তামাদির সুরক্ষা হারাবেন। এই কঠোর নিয়মটি পরবর্তীতে
উপমহাদেশীয় (ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ) আদালতসমূহ গ্রহণ করে, তবে সময়ের সাথে এটি কিছুটা
নমনীয় হয়েছে। সম্পূর্ণ নতুন cause of action প্রবর্তনের ক্ষেত্রে এই বিধি কঠোরভাবে
প্রযোজ্য হলেও, বিদ্যমান দাবির সম্প্রসারণ বা স্পষ্টীকরণের ক্ষেত্রে আদালত অধিকতর নমনীয়
দৃষ্টিভঙ্গি নেয় (ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের L.J. Leach & Co. v. Jardine
Skinner এবং Charan Das v. Amir Khan মামলায় এই নমনীয়তার কথা বলা হয়েছে)।
বাংলাদেশের আদালতে প্রতিষ্ঠিত
নজির
- Government of Bangladesh and another vs Shafi A Chowdhury and another, 55 DLR 228 মামলার এক প্রকৃতি থেকে অন্য প্রকৃতিতে রূপান্তর করে এবং একটি স্বতন্ত্র cause of action-কে অন্য একটি দিয়ে প্রতিস্থাপন করে যদি অপর পক্ষের লাপস অব টাইম-এ অর্জিত অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, তবে এমন সংশোধন অনুমোদন করা যায় না।
- Gold Topps Co Hong Kong and others vs TCB and another, 53 DLR 280 প্রস্তাবিত সংশোধন মঞ্জুর করলে তা মামলা দায়েরের তারিখ থেকে কার্যকর হয়ে যাবে, ফলে বাদীর তামাদি-বারিত দাবিটি নতুন জীবন পাবে এবং বিবাদী পক্ষ লাপস অব টাইমের কারণে অর্জিত একটি মূল্যবান আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে যা স্পষ্টতই অন্যায্য।
গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম
এই নিয়ম নিরঙ্কুশ নয়। যদি প্রস্তাবিত সংশোধনের ভিত্তি মূল প্লিডিংসেই বিদ্যমান থাকে অর্থাৎ এটি সম্পূর্ণ নতুন cause of action তৈরি না করে বরং বিদ্যমান দাবিরই একটি বিস্তারিত রূপ বা স্পষ্ট প্রকাশ হয় তাহলে তামাদির আপত্তি প্রযোজ্য হয় না, কেননা এক্ষেত্রে সংশোধনটি 'নতুন দাবি' হিসেবে গণ্য হয় না বলে relation-back-জনিত তামাদি-বাধা এখানে খাটে না।
পরিশেষে বলা যায় যে, ন্যায়বিচারের স্বার্থে আদালত অপর পক্ষের সম্ভাব্য
ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করে মামলার যে কোন পর্যায়ে প্লিডিংস সংশোধন করতে পারেন। অবস্থার
পরিপ্রেক্ষিতে যতদূর সম্ভব নমনীয় মনোভাব গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয় বলে সুপ্রিম কোর্ট বিভিন্ন
মামলায় অভিমত ব্যক্ত করেছেন। এই উদার দৃষ্টিভঙ্গির শিকড় প্রিভি কাউন্সিলের Ma
Shwe Mya নীতিতে প্রোথিত, যা অদ্যাবধি বাংলাদেশের আদালতে অনুসৃত হচ্ছে।
সহায়তা নেওয়া হয়েছে:
- lawyersnjurists.com
- clcbd.org (Chancery Law Chronicles)

0 Comments