সর্বশেষ

6/recent/ticker-posts

সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের ট্রায়াল(১৮৫৮): প্রশ্নবিদ্ধ বিচার (The Trial of the Last Mughal: Victor’s Vengeance)

 

১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ, ক্রাউন রুল, আইন ইতিহাস, লিগ্যাল হিস্ট্রি, তুলনামূলক আইন, আন্তর্জাতিক আইন প্রেক্ষাপট, যুদ্ধাপরাধ ধারণার উৎস, ন্যায়বিচারের সংজ্ঞা, ফেয়ার ট্রায়াল নীতি, ন্যায্য বিচারের অধিকার, আইনের শাসন, রুল অব ল, মানবিক মর্যাদা, রাজনৈতিক শহীদ, বিদ্রোহী নেতা, প্রতীকী বিচার, ক্ষমতার হস্তান্তর, সার্বভৌমত্বের হস্তান্তর, কলোনিয়াল সভরিনটি, সাম্রাজ্যের রাজনীতি, ব্রিটিশ প্রশাসনিক ইতিহাস, উপনিবেশ বিরোধী সাহিত্য, ইতিহাসের শিক্ষা, বাংলা ব্লগ ইতিহাস, আইন শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিহাস, ল স্টুডেন্ট রিসোর্স, বার কাউন্সিল প্রস্তুতি, আইনি ইতিহাসের নিবন্ধ, ঐতিহাসিক মামলা বিশ্লেষণ, কেস স্টাডি ইতিহাস, বিচার বিভাগীয় ইতিহাস, প্রাক-স্বাধীনতা ভারত, ঔপনিবেশিক যুগের বিচার ব্যবস্থা, মুঘল আইন ব্যবস্থা, শরিয়া ও ব্রিটিশ আইন সংঘাত, ইসলামি আইন প্রেক্ষাপট, ধর্মীয় নেতৃত্বের অভিযোগ, খলিফা তত্ত্ব, ইসলামিক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, ব্রিটিশ প্রোপাগান্ডা, ঐতিহাসিক বিতর্ক, ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন, উত্তর-ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি, পোস্ট কলোনিয়াল স্টাডিজ, সাম্রাজ্যের স্মৃতি, ঐতিহাসিক স্মৃতিসৌধ,
ক্রেডিটঃ enrouteindianhistory


১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দিল্লির শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেওয়া ও ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করে। এই বিচার শুধু একজন ব্যক্তির বিচার ছিল না, এর মাধ্যমে প্রায় সাড়ে তিনশ বছরের মুঘল সাম্রাজ্যের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে এবং ভারতীয় উপমহাদেশে সার্বভৌম ক্ষমতা মুঘল সম্রাটের কাছ থেকে ব্রিটিশ ক্রাউনের হাতে স্থানান্তরিত হয়।

গ্রেপ্তার ও প্রেক্ষাপট

১৮৫৭ সালের সেপ্টেম্বরে ব্রিটিশ বাহিনী দিল্লি পুনর্দখল করার পর ৮২ বছর বয়সী বৃদ্ধ সম্রাট হুমায়ুনের সমাধিতে আশ্রয় নেন। ক্যাপ্টেন উইলিয়াম হডসন তাঁকে গ্রেপ্তার করেন এবং তাঁর প্রাণনাশ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আত্মসমর্পণে রাজি করান। এই প্রতিশ্রুতি পরবর্তীতে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক বলে বিবেচিত হয়, যার ফলে বিচারে দোষী সাব্যস্ত হলেও তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায়নি।

বিচার প্রক্রিয়া

  • স্থান: লাল কেল্লার দিওয়ান-ই-খাস (যেখানে তিনি নিজেই বন্দি হিসেবে রাখা হয়েছিলেন)
  • শুরু: ২৭ জানুয়ারি, ১৮৫৮
  • সমাপ্তি: ৯ মার্চ, ১৮৫৮
  • বিচারকারী সংস্থা: একটি সামরিক কমিশন (Military Commission) যা প্রথাগত অর্থে আদালত, তদন্ত কমিশন বা সামরিক ট্রাইব্যুনাল কোনোটিই ছিল না
  • প্রধান কৌঁসুলি: মেজর হ্যারিয়ট (Major Harriott)

বিচার শুরুর প্রায় ২০ দিন আগে অভিযোগপত্রের অনূদিত কপি সম্রাটকে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বিচারের প্রথম দিকে তিনি বুঝতেই পারছিলেন না তাঁকে দোষী নাকি নির্দোষ, কোনটি বলতে বলা হচ্ছে। পরবর্তীতে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।

বিচারের অনিয়ম

এই বিচার ইতিহাসবিদদের মতে ন্যায়বিচারের চেয়ে বিজয়ীর প্রতিশোধের রূপ বেশি ধারণ করেছিল:

  • সাক্ষ্য-প্রমাণের প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করা হবে না বলে বিচারের শুরুতেই ঘোষণা দেওয়া হয়
  • নথিপত্র যাচাই ছাড়াই আদালতে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়
  • কৌঁসুলি নিজেই স্বীকার করেন যে প্রমাণগুলো সরাসরি অভিযোগের সাথে নাও মিলতে পারে, এবং "কারিগরি ত্রুটি" যেন বিচারের পথে বাধা না হয়

অভিযোগসমূহ

সম্রাটের বিরুদ্ধে মূলত চারটি অভিযোগ আনা হয়:

  • সিপাহি বিদ্রোহে মদদ ও সহায়তা প্রদান
  • "হিন্দুস্থানে" নিজস্ব সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা
  • ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জনগণকে উদ্বুদ্ধ ও সহায়তা করা
  • খ্রিস্টানদের হত্যায় প্ররোচনা ও সহযোগিতা

বিচারে তিনি দাবি করেন যে তাঁর নামে জারি করা ফরমান ও আদেশের বিষয়ে তিনি সম্পূর্ণ অবগত ছিলেন না এবং এর দায় সেনাপ্রধান বখত খান বা বিদ্রোহী সেনাবাহিনীর ওপর চাপান, যাদের সামনে তিনি নিজেকে "শক্তিহীন" বলে বর্ণনা করেন।

রায় ও দণ্ড

৯ মার্চ, ১৮৫৮ তারিখে বিকেল ৩টায় সামরিক কমিশন সর্বসম্মতিক্রমে সম্রাটকে "তাঁর বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগে সম্পূর্ণরূপে দোষী" ঘোষণা করে। স্বাভাবিক নিয়মে এই রায়ে বিশ্বাসঘাতকতা ও অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড হওয়ার কথা থাকলেও ক্যাপ্টেন হডসনের দেওয়া জীবনরক্ষার প্রতিশ্রুতির কারণে তা কার্যকর করা হয়নি। পরিবর্তে তাঁকে নির্বাসন এ পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ অথবা গভর্নর জেনারেলের নির্বাচিত অন্য কোনো স্থানে।

নির্বাসন ও মৃত্যু

উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ ও তৎকালীন অস্থির পরিস্থিতির কারণে সাত মাস বিলম্বের পর, ৭ অক্টোবর ১৮৫৮ তারিখে ভোররাতে সম্রাট তাঁর স্ত্রী জিনাত মহল ও দুই অবশিষ্ট পুত্রসহ বলদগাড়িতে চড়ে দিল্লি ত্যাগ করে রেঙ্গুন (বর্তমান ইয়াঙ্গুন), বার্মার উদ্দেশ্যে রওনা হন। সেখানেই ১৮৬২ সালে ৮৭ বছর বয়সে চরম দারিদ্র্য ও অবহেলার মধ্যে তাঁর মৃত্যু হয়। নির্বাসনকালে তিনি অসংখ্য গজল রচনা করেন, যা উর্দু সাহিত্যে আজও গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

ঐতিহাসিক ও আইনি তাৎপর্য

এই বিচারের বৈধতা নিয়ে বহু প্রশ্ন থেকে যায়:

  • এখতিয়ারের প্রশ্ন: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারতে বিচার পরিচালনার আইনগত ক্ষমতা মূলত এসেছিল পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলার "দেওয়ানি" লাভের মাধ্যমে যা স্বয়ং মুঘল সম্রাটের কাছ থেকেই প্রাপ্ত। ফলে যে প্রতিষ্ঠান তার ক্ষমতার উৎস হিসেবে মুঘল সম্রাটকে স্বীকার করত, সেই প্রতিষ্ঠানই সম্রাটের বিচার করার নৈতিক ও আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
  • প্রতীকী গুরুত্ব: এই বিচার ও রায়ের মধ্য দিয়ে মুঘল রাজবংশের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটানো হয় এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থাকে পুনর্গঠিত করা হয়।
  • তুলনামূলক প্রেক্ষাপট: পরবর্তীতে ১৯৪৫ সালে একই লাল কেল্লায় আজাদ হিন্দ ফৌজের (INA) সেনানায়কদের বিচার অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ভুলাভাই দেশাইয়ের নেতৃত্বে আইনি দল ঔপনিবেশিক শাসকের এখতিয়ার নিয়ে একই প্রশ্ন জোরালোভাবে তুলে ধরেন।

উপসংহার

বাহাদুর শাহ জাফরের বিচার প্রথাগত অর্থে ন্যায়বিচারের চেয়ে বিজয়ী শক্তির রাজনৈতিক প্রতিশোধ ও ঔপনিবেশিক ক্ষমতা সংহতকরণের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত। সাক্ষ্য-প্রমাণের নিয়ম উপেক্ষা করা, পূর্বনির্ধারিত ফলাফল এবং এখতিয়ার সংক্রান্ত অমীমাংসিত প্রশ্ন। এই সবকিছু মিলিয়ে এই বিচারকে ইতিহাসবিদরা প্রায়ই "বিচারের রূপে অনুষ্ঠিত এক অনুসন্ধান" (inquisition masquerading as a trial) বলে অভিহিত করেন। তবু এর তাৎপর্য অনস্বীকার্য: এই একটি বিচারের মধ্য দিয়েই ভারতে মুঘল শাসনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে এবং ব্রিটিশ ক্রাউনের সরাসরি শাসনের পথ প্রশস্ত হয়।


তথ্যসূত্র:

1. Ball, Charles. (1858–9) ‘The History of the Indian Mutiny’. vol. 2.
2. Campbell, G. (1893). ‘Memoirs of my Indian Career’. Vol 1. Macmillan.
3. Dalrymple, W. (2006). ‘The Last Mughal’. Bloomsbury.
4. Haldar, S. (2025). ‘Taking Sovereignty to Court: An Inquiry into the Trial of Bahadur Shah Zafar’. University of Chicago.
5. Hodson, W.S.R. (1860). ‘Twelve Years’ of a Soldier’s Life in India’. Boston: Ticknor and Fields.
6. Gupta, Narayani. (1981). “Delhi between two empires, 1803-1931 : society, government and urban growth’. Delhi : Oxford University Press.
7. Oriental and India Office Collections, British Library, Vibart Papers, Eur Mss 135/19, Vibart to his Uncle Gordon, 22 September 1857.
8. Proceedings on the Trial of Muhammad Bahadur Shah, Titular King of Delhi, before a Military Commission, upon a charge of Rebellion, Treason and Murder, held at Delhi, on the 27th Day of January 1858, and following days London, 1859
9. Russell, W.H. (1860). ‘My Diary in India’. London. vol. 1 & 2.
10. Spear, P. (1951). ‘Twilight of the Mughuls’. Cambridge at the University Press.
11. Spear, P. (1937). ‘Delhi: A Historical Sketch’. Humphrey Milford: Oxford University Press.
12. Vibart, E. (1898). ‘The Sepoy Munity’. London.

Post a Comment

0 Comments