সর্বশেষ

6/recent/ticker-posts

ধর্ষণ মামলায় 'টু-ফিঙ্গার টেস্ট' (Two-Finger Test) নিষিদ্ধকরণ

 

টু-ফিঙ্গার টেস্ট, দুই আঙুলের পরীক্ষা, Two-Finger Test, Hymen Examination, Rape Case Trial, Bangladesh High Court Verdict 2018, Justice Gobinda Chandra Tagore, Justice A.K.M. Shahidul Huq, Writ Petition 10663 of 2013, Violation of Human Rights, Unscientific Medical Practice, Forensic Protocol, DNA Testing, Evidence Act Section 155(4), Women's Rights, Gender-Based Violence, Colonial Legal Legacy, Bangladesh Supreme Court, Legal Reform, Forensic Medicine, International Human Rights, WHO Guidelines, Lillu v. Haryana, Sadaf Aziz v. Pakistan, Y.F. v. Turkey, Rape Shield Laws, Judiciary and Society, Judicial Sensitivity, Victim Protection, Dignity of Women, Crime Investigation, Criminology, Legal History, Elimination of Discriminatory Practices, Modern Judicial Process, Legal Analysis, BLAST, Ain o Salish Kendra, Bangladesh Mahila Parishad, Historic Judicial Ruling, Constitutional Articles 27 and 32, Protection of Fundamental Rights, Criminal Investigation System, Forensic Examination, Legal Awareness, Victim-Friendly Justice System,ধর্ষণ মামলা, হাইকোর্ট রায় ২০১৮, বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুর, বিচারপতি এ কে এম শহিদুল হক, রিট পিটিশন ১০৬৬৩/২০১৩, মানবাধিকার লঙ্ঘন, অবৈজ্ঞানিক প্রথা, মেডিকেল প্রোটোকল, ডিএনএ টেস্ট, সাক্ষ্য আইন ১৫৫ অনুচ্ছেদ, নারী অধিকার, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, ঔপনিবেশিক আইনি উত্তরাধিকার, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, আইনি সংস্কার, ফরেনসিক মেডিসিন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, ডব্লিউএইচও গাইডলাইন, লিলু বনাম হরিয়ান মামলা, সাদাফ আজিজ মামলা, ওয়াই এফ বনাম তুরস্ক, রেপ শিল্ড ল, সমাজ ও বিচারব্যবস্থা, বিচারিক সংবেদনশীলতা, ভুক্তভোগী সুরক্ষা, নারীর মর্যাদা, অপরাধ দমন, অপরাধ বিজ্ঞান, আইনগত ইতিহাস, বৈষম্যমূলক প্রথা বিলোপ, আধুনিক বিচার প্রক্রিয়া, আইনি বিশ্লেষণ, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), আইন ও সালিশ কেন্দ্র, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, বিচার বিভাগের ঐতিহাসিক রায়, সংবিধানের ২৭ ও ৩২ অনুচ্ছেদ, মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ, অপরাধ তদন্ত ব্যবস্থা, ফরেনসিক পরীক্ষা,

ধর্ষণ মামলায় 'টু-ফিঙ্গার টেস্ট' (Two-Finger Test) নিষিদ্ধকরণ: বাংলাদেশ হাইকোর্ট বিভাগের ঐতিহাসিক নির্দেশনাবলী ও আইনি পর্যালোচনা

ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার শিকার নারীদের ডাক্তারি পরীক্ষার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিকভাবে ব্যবহৃত 'টু-ফিঙ্গার টেস্ট' (Two-Finger Test) বা 'দুই আঙুলের পরীক্ষা' হলো একটি অবৈজ্ঞানিক, অপচিকিৎসাসুলভ এবং অত্যন্ত কুৎসিত প্রথা। দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও আইনশাস্ত্র উভয় ক্ষেত্রেই প্রমাণিত হয়েছে যে, এই পরীক্ষার মাধ্যমে ধর্ষণ সংঘটিত হয়েছে কি না তা নির্ধারণ করা পুরোপুরি অসম্ভব। বরং এটি ভুক্তভোগীর ওপর শারীরিক ও মানসিকভাবে দ্বিতীয়বার নির্যাতনের সামিল। বাংলাদেশের উচ্চ আদালত মানবাধিকার, চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের আলোকে এই টু-ফিঙ্গার টেস্টকে সম্পূর্ণ বেআইনি, বৈষম্যমূলক ও সংবিধান পরিপন্থী হিসেবে ঘোষণা করে তা চিরতরে নিষিদ্ধ করেছেন।

টু-ফিঙ্গার টেস্ট কী এবং কেন বিতর্কিত 

টু-ফিঙ্গার টেস্ট (per vaginum বা PV পরীক্ষা) হলো চিকিৎসক কর্তৃক যোনিতে দুই আঙুল প্রবেশ করিয়ে হাইমেন অক্ষত আছে কিনা এবং যোনিমুখের আকার ও শিথিলতা দেখার একটি আক্রমণাত্মক পরীক্ষা. এই পরীক্ষার ফল দিয়ে ধর্ষণের শিকার নারীকে “habituated to sexual intercourse” (যৌন সহবাসে অভ্যস্ত) বলে চিহ্নিত করা হতো। এতে তাঁর নৈতিক চরিত্র নিয়ে সন্দেহ তৈরি হতো এবং সম্মতির মূল প্রশ্ন আড়ালে চলে যেত।

icddr,b বলেন, হাইমেনের অবস্থা বা যোনির শিথিলতা দিয়ে যৌন নির্যাতন বা সম্মতির উপস্থিতি-অনুপস্থিতি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ বা অপ্রমাণ করা যায় না; শিথিলতা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়. টেস্টটি উপনিবেশিক আমলের ব্রিটিশ চিকিৎসা-আইনশাস্ত্রের মাধ্যমে উপমহাদেশে এসেছিল যা আগে সাক্ষ্য আইনের ১৫৫(৪) ধারা ধর্ষণ মামলায় ভিকটিমের “চরিত্র” প্রমাণের সুযোগ দিত। 


প্রযুক্তিগত ও বৈজ্ঞানিক অসারতা:

  • অবৈজ্ঞানিক ধারণা: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), রাষ্ট্রসংঘ মানবাধিকার কমিশন (UNHCR) এবং আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞান নিশ্চিত করেছে যে সতীচ্ছদের অবস্থা দিয়ে কোনো নারীর অতীত যৌন অভিজ্ঞতা বা ধর্ষণের সত্যতা নিরূপণ করা অসম্ভব।
  • শারীরিক ভিন্নতা: খেলাধুলা, শারীরিক পরিশ্রম, সাইকেল চালানো বা সহজাত শারীরিক গঠনের কারণেও সতীচ্ছদ অক্ষত না থাকতে পারে। তাই এর সাথে ধর্ষণের সম্পর্ক স্থাপন সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
  • সম্মতির বিষয়: ধর্ষণ হলো সম্মতাহীন বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ। নারী পূর্বে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত ছিলেন কি না, তা দিয়ে বর্তমানের অনাকাঙ্ক্ষিত ধর্ষণকে অস্বীকার বা বিচার করা আইনি দৃষ্টিতেও সম্পূর্ণ অবৈধ।

‘টু-ফিঙ্গার টেস্ট’ (Two-Finger Test)  কেমনে  আসলো

‘টু-ফিঙ্গার টেস্ট’ বা দুই আঙুলের পরীক্ষার মতো অবৈজ্ঞানিক ও মর্যাদাহানিকর প্রথাটি আমাদের দেশে মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন আমলের আইনি ও চিকিৎসা ব্যবস্থার উত্তরাধিকার হিসেবে প্রবেশ করেছিল। এটি দেশীয় কোনো প্রাচীন প্রথা ছিল না; বরং ঔপনিবেশিক শাসনামলে ব্রিটিশ ও ইউরোপীয় ফরেনসিক চিকিৎসা পদ্ধতি অন্ধভাবে অনুকরণ করার মাধ্যমেই এটি এ অঞ্চলে শিকড় গেড়ে বসে।

উনিশ শতকে ব্রিটিশ সমাজে নারীর কুমারিত্ব ও সতীত্ব নিয়ে রক্ষণশীল ও পুরুষতান্ত্রিক কিছু ধারণা প্রবল ছিল। তৎকালীন ব্রিটিশ চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা নারীর সতীচ্ছদ ও যোনিপথের শিথিলতা পরীক্ষা করে তার অতীত যৌন অভিজ্ঞতা নির্ধারণের একটি ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতি দাঁড় করিয়েছিলেন। ব্রিটিশরা যখন ভারতীয় উপমহাদেশে তাদের প্রশাসনিক কাঠামো, পেনাল কোড এবং ফরেনসিক পরীক্ষা ব্যবস্থা চালু করে, তখন এই অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিটি পুলিশি তদন্ত ও মেডিকেল প্রোটোকলের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।

 

সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের আলোকে বিশ্লেষণ

টু-ফিঙ্গার টেস্ট শুধুমাত্র চিকিৎসাবিজ্ঞানের অবমাননা নয়, এটি দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘন:

বাংলাদেশ সংবিধানের লঙ্ঘন:

  • অনুচ্ছেদ ২৭ (সমতা): সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং সমান আশ্রয়ের অধিকারী। টু-ফিঙ্গার টেস্ট নারীদের প্রতি চরম বৈষম্য সৃষ্টি করত।
  • অনুচ্ছেদ ৩১ ও ৩২ (স্বাধীনতা ও সুরক্ষা): সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইনের আশ্রয় লাভ এবং জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে। অবৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নারীর জীবন ও মর্যাদাকে আঘাত করে।
  • অনুচ্ছেদ ৩৫(৫) (অমানুষিক আচরণ রোধ): সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া বা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড বা ব্যবহার করা যাবে না। টু-ফিঙ্গার টেস্ট ভুক্তভোগীকে মানসিকভাবে চরম লাঞ্ছিত করত।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের লঙ্ঘন:

CEDAW সনদ: জাতিসংঘের সিডো (CEDAW) সনদের অনুচ্ছেদ ২ ও ৫ অনুযায়ী নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।


UDHR: মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র (UDHR)-এর অনুচ্ছেদ ৫ অনুযায়ী কারো প্রতি অমানুষিক বা মর্যাদা হানিকর আচরণ নিষিদ্ধ।

প্রাসঙ্গিক অন্যান্য আইনি সংস্কার: সাক্ষ্য আইনের ১৫৫(৪) ধারা বিলোপ

টু-ফিঙ্গার টেস্ট বন্ধের পাশাপাশি বাংলাদেশে ধর্ষণ মামলার বিচারে আরেকটি যুগান্তকারী সংস্কার সাধিত হয়েছে। ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের (Evidence Act, 1872) ১৫৫(৪) ধারা বাতিল করা হয়েছে।

উক্ত ১৫৫(৪) ধারায় বলা ছিল যে, জেরা করার সময় ভুক্তভোগী নারী 'সাধারণ চরিত্রহীন' (generally of immoral character) মর্মে প্রমাণ করার সুযোগ আসামিপক্ষের ছিল। আদালত ও জাতীয় সংসদ পরবর্তীতে উপলব্ধি করে যে নারীর অতীত চরিত্র দিয়ে ধর্ষণের অপরাধ ঢাকা দেওয়া বা যুক্তিসিদ্ধ করা যায় না। তাই উক্ত অমানবিক ধারাটি ২০২২ সালের বিলুপ্ত করা হয়।

আন্তর্জাতিক বিশ্বের ঐতিহাসিক নজিরসমূহ (International Precedents)

টু-ফিঙ্গার টেস্ট নিষিদ্ধকরণ এবং ধর্ষণের বিচারে ভুক্তভোগী নারীর সম্মান রক্ষায় বিশ্বব্যাপী বিচারবিভাগীয় ও সংস্থাভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ নজিরসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো:

ক. ভারত (Supreme Court of India)

১. ঐতিহাসিক রায় (২০১৩): Lillu @ Rajesh & Anr. v. State of Haryana (2013) 14 SCC 643- ভারতের সুপ্রিম কোর্ট টু-ফিঙ্গার টেস্টকে সম্পূর্ণ বেআইনি, নির্যাতনমূলক এবং সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ (জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার) পরিপন্থী বলে ঘোষণা করেন।

২. পুনর্নির্বন্ধ ও কঠোর নির্দেশ (২০২২): State of Jharkhand v. Shailendra Kumar Rai (2022)- সুপ্রিম কোর্ট পুনরায় নির্দেশ দেন যে টু-ফিঙ্গার টেস্ট করা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে এবং কেউ এই পরীক্ষা করালে তা অপরাধমূলক অসদাচরণ (Misconduct) হিসেবে গণ্য হবে।

খ. পাকিস্তান (Lahore High Court & Supreme Court)

লাহোর হাইকোর্টের রায় (২০২১): Sadaf Aziz v. Federation of Pakistan (2021)- লাহোর হাইকোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে ঘোষণা করেন যে ধর্ষণের শিকার নারীর ক্ষেত্রে 'টু-ফিঙ্গার টেস্ট' বা সতীচ্ছদ পরীক্ষা সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক, নারীর মর্যাদা পরিপন্থী এবং পাকিস্তান সংবিধানের ৯ ও ১৪ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। আদালত পুরো পাঞ্জাব প্রদেশে এই পরীক্ষা চিরতরে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।

গ. আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সংস্থাভিত্তিক নির্দেশিকা (WHO, UN Women, OHCHR)

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO Guidelines): বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিশন (OHCHR) এবং ইউএন উইমেন (UN Women) যৌথভাবে নির্দেশিকা জারি করে ঘোষণা করে: 'Two-finger test has no scientific validity and is a violation of human rights.' (দুই আঙুলের পরীক্ষার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই এবং এটি মানবাধিকারের পরিপন্থী)।

ঘ. ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত (European Court of Human Rights - ECtHR)

ইউরোপীয় আদালতের রায় (২০০৩): Y.F. v. Turkey (2003) - ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত রায় দেন যে কোনো নারীর সম্মতি ব্যতিরেকে জোরপূর্বক বা বাধ্যতামূলকভাবে সতীচ্ছদ পরীক্ষা করা মানবাধিকার সনদের অনুচ্ছেদ ৮ (ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তার অধিকার)-এর স্পষ্ট লঙ্ঘন।

ঙ. যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য (Rape Shield Laws)

যুক্তরাষ্ট্র (USA): Federal Rule of Evidence 412 (Rape Shield Law) -জেরা করার সময় ভুক্তভোগী নারীর অতীত যৌন আচরণ বা চরিত্র সম্পর্কে আদালতে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন বা প্রশ্ন তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

যুক্তরাজ্য (UK): Youth Justice and Criminal Evidence Act 1999 (Section 41)- ভুক্তভোগীর অতীত যৌন জীবনের ইতিহাস আদালতে উত্থাপন করার সুযোগ কঠোরভাবে সীমিত করা হয়েছে।

 ঐতিহাসিক হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনাবলী ও মামলার বিবরণ

বাংলাদেশে টু-ফিঙ্গার টেস্টের বেআইনি চর্চা বন্ধে মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (BLAST), আইন ও সালিশ কেন্দ্র (ASK), বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এবং কয়েকজন বিশিষ্ট চিকিৎসকের যৌথ উদ্যোগে ২০১৩ সালে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন (রীট পিটিশন নং- ১০৬৬৩/২০১৩) দায়ের করা হয়।

হাইকোর্টের মূল পর্যবেক্ষণ (Key Judicial Observation):

“যৌন নির্যাতনের শিকার নারীর ক্ষেত্রে টু-ফিঙ্গার টেস্ট বা দুই আঙুলের পরীক্ষা সম্পূর্ণরূপে বেআইনি, বৈষম্যমূলক ও অবৈজ্ঞানিক। যেকোনো ডাক্তারি পরীক্ষায় ভুক্তভোগী নারীর সম্মতি ব্যতিরেকে পরীক্ষা চালানো যাবে না এবং তাঁর সম্মান ও মানসিক সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে হবে।”
— হাইকোর্ট বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট (বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট বনাম বাংলাদেশ মামলা)

 

হাইকোর্ট বিভাগের দেওয়া সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাবলী:


১. চিরতরে নিষেধাজ্ঞা: ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার নারীদের শারীরিক চিকিৎসায় টু-ফিঙ্গার টেস্ট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো। কোনো অবস্থাতেই এই পরীক্ষা করা যাবে না।


২. নতুন হেলথ প্রোটোকল প্রবর্তন: স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেয়া হয় যে, তারা একটি আধুনিক, আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত ও সম্মানজনক 'মেডিকেল প্রোটোকল' (Health Protocol) তৈরি করে সকল সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে পাঠাবে।


৩. ফরেনসিক প্রমাণের আধুনিকায়ন: প্রমাণ হিসেবে ডিএনএ টেস্ট (DNA Test), ফরেনসিক নমুনা সংগ্রহ, শারীরিক আঘাতের দাগ পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবাকে প্রাথমিক অগ্রাধিকার দিতে হবে।

৪. প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা: চিকিৎসক, পুলিশ কর্মকর্তা ও বিচারিক বিচারকদের সংবেদনশীলকরণ এবং আধুনিক ফরেনসিক প্রোটোকল অনুসরণে প্রশিক্ষণ প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়।


৫. ভুক্তভোগীর অধিকার ও সম্মান: ভুক্তভোগী নারীর পরিচয় গোপন রাখা এবং আদালতে জেরার সময় অপমানজনক প্রশ্ন রোধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের তাগিদ দেওয়া হয়।

বর্তমান পরিস্থিতি ও সুপারিশসমূহ

উচ্চ আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনার পর বর্তমানে বাংলাদেশে আইনি ও চিকিৎসা নথিতে টু-ফিঙ্গার টেস্টের ব্যবহার নিষিদ্ধ হয়েছে। তবে সার্বিক বাস্তবায়নে নিম্নলিখিত ব্যবস্থাগুলো অব্যাহত রাখা প্রয়োজন:

১. ফরেনসিক ল্যাবের সক্ষমতা বৃদ্ধি: সকল জেলা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে ডিএনএ ল্যাব ও ফরেনসিক অবকাঠামোর পরিধি আরও বাড়াতে হবে।

২. প্রোটোকল বাস্তবায়ন ও মনিটরিং: ডাক্তার ও মেডিকেল অফিসাররা যেন কোনোভাবেই নতুন প্রোটোকলের বাইরে গিয়ে ভুক্তভোগীকে অযাচিত প্রশ্ন বা পরীক্ষা না করেন, তা তদারকি করা।

৩. পুলিশি তদন্তের মানোন্নয়ন: মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাদের (IO) আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ সংগ্রহের প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ করে তোলা।

৪. বিচারিক সংবেদনশীলতা: আদালতে বিচার চলার সময় ভুক্তভোগীকে ভীতিমুক্ত পরিবেশে সাক্ষ্য প্রদানের সুযোগ এবং 'ইন-ক্যামেরা ট্রায়াল' (In-camera trial) কার্যকর রাখা।

উপসংহার

ধর্ষণ মামলায় 'টু-ফিঙ্গার টেস্ট' বাতিলকরণ বাংলাদেশের আইনি ইতিহাসে ভুক্তভোগী নারীর মানবাধিকার, সম্মান ও মর্যাদা সুরক্ষায় একটি অনন্য মাইলফলক। উচ্চ আদালতের বিচারিক সক্রিয়তা ও নির্দেশনাবলী দেশে প্রথাগত কুসংস্কার ও বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে বিজ্ঞানসম্মত ও আধুনিক বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। নির্দেশনাবলীর শতভাগ বাস্তবায়ন নিশ্চিতকরণের মাধ্যমেই একটি বিচারপ্রার্থীবান্ধব ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

Post a Comment

0 Comments