দণ্ডবিধির ৩৪, ১৪৯, ১০৭ ও ১২০-ক ধারা
পরার্থ দায় (Vicarious Liability) ও গঠনমূলক অপরাধমূলক দায় (Constructive
Criminal Liability)
প্রশ্ন: দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩৪, ১৪৯, ১০৭ ও ১২০-ক ধারার আলোকে পরার্থ দায় বা গঠনমূলক অপরাধমূলক দায় কীভাবে সৃষ্টি হয়, সংক্ষেপে বর্ণনা করুন।
ভূমিকা
ফৌজদারি আইনের সাধারণ নীতি হলো, ব্যক্তি সাধারণত নিজের অপরাধমূলক
কাজ ও অপরাধী অভিপ্রায়ের জন্য দায়ী হন। তবে অপরাধ যৌথ পরিকল্পনা, সাধারণ অভিপ্রায়,
বে-আইনি সমাবেশ, প্ররোচনা বা অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সংঘটিত হলে নির্দিষ্ট শর্তে
এমন ব্যক্তিকেও দায়ী করা যায়, যিনি নিজ হাতে অপরাধের সব উপাদান সম্পাদন করেননি। একে
প্রসঙ্গভেদে গঠনমূলক অপরাধমূলক দায় (constructive criminal liability) বা বিস্তৃত অর্থে
পরার্থ দায় বলা হয়। এই দায় স্বয়ংক্রিয় নয়; সংশ্লিষ্ট ধারার উপাদান প্রমাণ করতে হয়।
১. সাধারণ অভিপ্রায়—ধারা ৩৪ (Common Intention)
৩৪ ধারায় বলা হয়েছে, একাধিক ব্যক্তি সকলের অভিন্ন অভিপ্রায় বাস্তবায়নের
জন্য কোনো অপরাধমূলক কাজ করলে প্রত্যেকে ওই কাজের জন্য এমনভাবে দায়ী হবেন, যেন কাজটি
তিনি একাই করেছেন। এটি নিজে স্বতন্ত্র অপরাধ নয়; যৌথ অপরাধে দায় নির্ধারণের নীতি।
প্রধান উপাদান
- 1. অপরাধমূলক কাজ সংঘটিত হতে হবে।
- 2. একাধিক ব্যক্তি অপরাধমূলক কাজে অংশ নেবেন।
- 3. তাঁদের মধ্যে অভিন্ন অভিপ্রায় (common intention) থাকতে হবে।
- 4. অপরাধমূলক কাজটি ওই অভিন্ন অভিপ্রায় বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে হবে।
অভিন্ন অভিপ্রায় পূর্বপরিকল্পনা বা পূর্বসম্মতির মাধ্যমে গড়ে উঠতে
পারে; তবে সব ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময়ের পূর্বপরিকল্পনা আবশ্যক নয়। ঘটনার সময়ও অভিন্ন অভিপ্রায়
তৈরি হতে পারে। প্রত্যেক আসামির আলাদা করে প্রাণঘাতী আঘাত করা বা পৃথক overt act করা
অপরিহার্য নয়; তবে তাঁর আচরণ থেকে অভিন্ন অভিপ্রায়ে অংশগ্রহণ প্রমাণিত হতে হবে।
উদাহরণ: ক, খ ও গ মিলে ঘ-কে হত্যা করার অভিন্ন অভিপ্রায়ে আক্রমণ
করেন। কে প্রাণঘাতী আঘাতটি করেছেন তা নির্দিষ্ট করা না গেলেও, যদি প্রমাণিত হয় যে তাঁরা
অভিন্ন অভিপ্রায় বাস্তবায়নে সম্মিলিতভাবে অংশ নিয়েছেন, তবে ৩০২ ধারার সঙ্গে ৩৪ ধারা
প্রয়োগ করে প্রত্যেককে দায়ী করা যেতে পারে।
২. বে-আইনি সমাবেশের সাধারণ উদ্দেশ্য—ধারা ১৪৯ (Common Object)
১৪৯ ধারা অনুযায়ী, কোনো বে-আইনি সমাবেশের (unlawful assembly) কোনো
সদস্য সমাবেশের সাধারণ উদ্দেশ্য (common object) বাস্তবায়নে অপরাধ করলে, অথবা এমন অপরাধ
সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা সদস্যরা জানতেন, তাহলে অপরাধ সংঘটনের সময় সমাবেশের সদস্য প্রত্যেক
ব্যক্তি সেই অপরাধের জন্য দায়ী হতে পারেন।
প্রধান উপাদান
- 5. দণ্ডবিধির ১৪১ ধারার অর্থে পাঁচ বা ততোধিক ব্যক্তির বে-আইনি সমাবেশ থাকতে হবে।
- 6. অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধ সংঘটনের সময় ওই সমাবেশের সদস্য হতে হবে।
- 7. সমাবেশের একটি সাধারণ উদ্দেশ্য থাকতে হবে।
- 8. অপরাধটি ওই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সংঘটিত হতে হবে, অথবা ওই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে এমন অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা সদস্যদের জানা থাকতে হবে।
১৪৯ ধারায় প্রত্যেক সদস্যের পৃথক আঘাত বা সরাসরি অপরাধ সংঘটনের
প্রমাণ সব ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় না। তবে শুধু ঘটনাস্থলে উপস্থিতি যথেষ্ট নয়—অভিযুক্তের
সদস্যপদ এবং common object/knowledge-সংক্রান্ত শর্ত প্রমাণ করতে হবে।
উদাহরণ: পাঁচ বা ততোধিক ব্যক্তি বলপ্রয়োগে কোনো ব্যক্তিকে জমি থেকে
উচ্ছেদের বে-আইনি উদ্দেশ্যে সমবেত হন। সমাবেশের একজন সদস্য সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে
গুরুতর আঘাত করলে, আইনগত শর্ত প্রমাণ সাপেক্ষে অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধেও ১৪৯ ধারা প্রযোজ্য
হতে পারে।
৩. প্ররোচনা বা অপরাধে সহায়তা—ধারা ১০৭ (Abetment)
১০৭ ধারায় abetment বা দুষ্কর্মে প্ররোচনা/সহায়তার তিনটি পদ্ধতি
রয়েছে। প্ররোচনাকারী (abettor) মূল অপরাধের প্রত্যক্ষ কর্তা না হলেও, ধারার শর্ত পূরণ
হলে দায়ী হতে পারেন।
- 9. প্ররোচনা (Instigation): কাউকে কোনো কাজ করতে উসকানি দেওয়া, প্ররোচিত করা বা ইচ্ছাকৃতভাবে সেই কাজ ঘটানোর ব্যবস্থা করা।
- 10. ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে প্ররোচনা (Abetment by conspiracy): এক বা একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে ষড়যন্ত্রে যুক্ত হওয়া এবং সেই ষড়যন্ত্রের অনুসরণে ও উদ্দেশ্যে কোনো কাজ বা বেআইনি কার্যবিরতি সংঘটিত হওয়া।
- 11. ইচ্ছাকৃত সাহায্য (Intentional aid): কোনো কাজ বা বেআইনি কার্যবিরতির মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করা।
গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য: ১০৭ ধারার দ্বিতীয় পদ্ধতিতে ষড়যন্ত্রের
পাশাপাশি ষড়যন্ত্রের অনুসরণে কোনো কাজ বা বেআইনি কার্যবিরতি ঘটতে হয়। অপরদিকে ১২০-ক
ধারায় অপরাধ সংঘটনের উদ্দেশ্যে করা চুক্তি নিজেই অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র হতে পারে, যদিও
পরবর্তী কোনো overt act না ঘটে।
উদাহরণ: ক, খ-কে আক্রমণ করার জন্য গ-কে উসকানি দেন এবং গ সেই প্ররোচনায়
আক্রমণ করেন। প্রযোজ্য উপাদান ও মানসিক উপাদান প্রমাণিত হলে ক-এর বিরুদ্ধে ১০৭ ধারার
সঙ্গে ১০৯ ধারা বা ঘটনার প্রকৃতি অনুযায়ী অন্য প্রাসঙ্গিক বিধান প্রয়োগ হতে পারে।
৪. অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র—ধারা ১২০-ক (Criminal Conspiracy)
১২০-ক ধারায় দুই বা ততোধিক ব্যক্তির মধ্যে (১) কোনো অবৈধ কাজ করা
বা করানোর, অথবা (২) কোনো বৈধ কাজ অবৈধ উপায়ে করা বা করানোর সম্মতিকে criminal
conspiracy বা অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র বলা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ শর্ত: চুক্তিটি যদি কোনো অপরাধ সংঘটনের জন্য হয়, তাহলে
চুক্তিটিই ষড়যন্ত্রের অপরাধ গঠনের জন্য যথেষ্ট হতে পারে; আলাদা overt act প্রমাণ করা
আবশ্যক নয়। কিন্তু চুক্তিটি যদি অপরাধ সংঘটনের চুক্তি না হয়ে অন্য অবৈধ কাজ বা বৈধ
কাজ অবৈধ উপায়ে করার চুক্তি হয়, তাহলে ধারার proviso অনুযায়ী চুক্তির বাইরে অন্তত একটি
কাজ চুক্তির অনুসরণে সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন।
প্রধান উপাদান
- 12. দুই বা ততোধিক ব্যক্তি থাকতে হবে।
- 13. কোনো অবৈধ কাজ বা বৈধ কাজ অবৈধ উপায়ে করার বিষয়ে সম্মতি/চুক্তি থাকতে হবে।
- 14. চুক্তির প্রকৃতি অনুসারে ১২০-ক ধারার proviso-তে বর্ণিত অতিরিক্ত কাজের শর্ত পূরণ হতে হবে।
১২০-ক ধারা ষড়যন্ত্রের সংজ্ঞা দেয়; শাস্তির বিধান রয়েছে ১২০-খ ধারায়।
গুরুতর অপরাধের ষড়যন্ত্রে ১২০-খ(১) এবং অন্যান্য ষড়যন্ত্রে ১২০-খ(২) প্রাসঙ্গিক হতে
পারে; তবে অন্য কোনো express punishment provision আছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
৫. ধারাগুলোর পার্থক্য
|
ধারা |
মূল ধারণা |
দায়ের ভিত্তি |
বিশেষ বৈশিষ্ট্য |
|
৩৪ |
Common
intention |
অভিন্ন অভিপ্রায়
ও যৌথ অংশগ্রহণ |
স্বতন্ত্র অপরাধ
নয়; দায় নির্ধারণের নীতি |
|
১৪৯ |
Common object |
বে-আইনি সমাবেশের
সদস্যপদ ও common object/knowledge |
সমাবেশে অন্তত
পাঁচজন |
|
১০৭ |
Abetment |
প্ররোচনা, নির্দিষ্ট
শর্তে ষড়যন্ত্র, ইচ্ছাকৃত সাহায্য |
ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে
abetment-এ অনুসরণকারী কাজ/বেআইনি কার্যবিরতি প্রয়োজন |
|
১২০-ক |
Criminal
conspiracy |
দুই বা ততোধিক
ব্যক্তির অবৈধ চুক্তি |
অপরাধ করার চুক্তিতে
overt act ছাড়াও অপরাধ গঠিত হতে পারে |
৬. প্রাসঙ্গিক বিচারিক নজির
১. The State v. Dafader Marfoth Ali Shah and others,
Criminal Appeal No. 23 of 2011, Appellate Division, judgment dated 30 April
2013: আপিল বিভাগ ১০৭ ধারার ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে প্ররোচনা এবং ১২০-ক/১২০-খ ধারার অপরাধমূলক
ষড়যন্ত্রের পার্থক্য আলোচনা করেছে। ১০৭ ধারার ষড়যন্ত্র-ভিত্তিক প্ররোচনায় ষড়যন্ত্রের
অনুসরণে কোনো কাজ বা বেআইনি কার্যবিরতি হওয়ার শর্ত রয়েছে; অপরাধ সংঘটনের চুক্তি নিজেই
১২০-ক ধারার অধীনে ষড়যন্ত্র হতে পারে।
২. Bazlul Huda v. The State, 18 BLT (AD) 30: ৩৪ ধারার common
intention বিষয়ে উদ্ধৃত নজির। পরবর্তী বিচারিক আলোচনায় এই মামলার আলোকে বলা হয়েছে,
অভিন্ন অভিপ্রায়ে অংশগ্রহণ প্রমাণিত হলে যৌথ দায় হতে পারে; তবে প্রত্যেক অভিযুক্তের
অভিন্ন অভিপ্রায়ে অংশগ্রহণ প্রমাণ করতে হবে।
৩. State v. Abul Khair and two others, 44 DLR 284: ৩৪ ধারায় প্রত্যেক
অভিযুক্তের পৃথক overt act অপরিহার্য নয়, যদি প্রমাণিত হয় যে অপরাধটি সকলের common
intention বাস্তবায়নে সংঘটিত হয়েছে।
৪. Death Reference No. 58 of 2013, High Court Division: রায়ে
৩৪ ও ১৪৯ ধারার পার্থক্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে—৩৪ ধারায় দায়ের ভিত্তি common
intention-সহ যৌথ অপরাধমূলক কাজ; ১৪৯ ধারায় দায়ের ভিত্তি বে-আইনি সমাবেশের সদস্যপদ
এবং common object/তার বাস্তবায়নে অপরাধ সংঘটন বা তার সম্ভাবনা সম্পর্কে জ্ঞান।
উপসংহার
দণ্ডবিধির ৩৪, ১৪৯, ১০৭ ও ১২০-ক ধারা যৌথ অপরাধে দায় নির্ধারণের
পৃথক ভিত্তি স্থাপন করে। ৩৪ ধারার কেন্দ্রে common intention; ১৪৯ ধারায় বে-আইনি সমাবেশের
common object বা সংশ্লিষ্ট অপরাধ সংঘটনের সম্ভাবনা সম্পর্কে জ্ঞান; ১০৭ ধারায়
instigation, conspiracy-ভিত্তিক abetment বা intentional aid; আর ১২০-ক ধারায় অপরাধমূলক
চুক্তি। ধারাগুলোকে একার্থক ধরে নেওয়া যাবে না—প্রতিটির নির্দিষ্ট উপাদান আলাদাভাবে
প্রমাণ করতে হবে।

0 Comments