অথবা দেওয়ানী কার্যবিধির ২০ ধারার বিধান আলোচনা করুন।
ভূমিকা
দেওয়ানী আদালতে কোনো মোকদ্দমা দায়ের
করার ক্ষেত্রে শুধু দাবির প্রকৃতি বিবেচনা করলেই চলে না; একই সঙ্গে আদালতের আর্থিক
(Pecuniary Jurisdiction) এবং আঞ্চলিক (Territorial Jurisdiction) এখতিয়ারও বিবেচনা
করতে হয়। এ বিষয়ে মূল বিধান রয়েছে দেওয়ানী কার্যবিধি, ১৯০৮ (Code of Civil
Procedure)-এর ১৫ থেকে ২০ ধারায় এবং দেওয়ানী আদালত আইন, ১৮৮৭-এ।
অতএব, কোন আদালতে একটি দেওয়ানী মামলা দায়ের করা হবে, তা নির্ধারণের জন্য দেওয়ানী কার্যবিধির ১৫–২০ ধারা এবং দেওয়ানী আদালত আইন, ১৮৮৭-এর বিধানসমূহ একত্রে বিবেচনা করতে হয়।
১. বিচার করার সর্বনিম্ন ক্ষমতাসম্পন্ন আদালতে
মামলা দায়ের (ধারা ১৫)
দেওয়ানী কার্যবিধির ১৫ ধারা অনুযায়ী, প্রত্যেকটি দেওয়ানী মোকদ্দমা এমন আদালতে দায়ের করতে হবে, যা মামলাটি বিচার করার ক্ষমতাসম্পন্ন সর্বনিম্ন আদালত। এখানে “সর্বনিম্ন আদালত” বলতে আদালতের আর্থিক এখতিয়ার বোঝানো হয়েছে।
উদাহরণ
ধরা যাক, একটি ক্ষতিপূরণের মামলার মূল্য ৩,০০,০০০ টাকা। এই মামলা জেলা জজ আদালতেও দায়ের করা সম্ভব হলেও আইনের নির্দেশনা হলো, যে আদালত সর্বনিম্ন পর্যায়ে এই মূল্যমানের মামলা বিচার করতে সক্ষম, সেখানেই মামলা দায়ের করতে হবে। সুতরাং মামলাটি সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে দায়ের করতে হবে।
আবার, যদি বিচার শেষে আদালত মাত্র ১,৫০,০০০ টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদান করে, তবুও সিনিয়র সহকারী জজের প্রদত্ত ডিক্রি বৈধ থাকবে। কারণ আদালতের এখতিয়ার নির্ধারিত হয় বাদীর আরজিতে উল্লেখিত দাবির মূল্যমান দ্বারা, পরবর্তীতে প্রদত্ত ডিক্রির পরিমাণ দ্বারা নয়।
২. আঞ্চলিক এখতিয়ার এবং স্থাবর সম্পত্তি সংক্রান্ত
মামলা (ধারা ১৬–১৮)
প্রত্যেক দেওয়ানী আদালতের একটি নির্দিষ্ট আঞ্চলিক এখতিয়ার রয়েছে। আদালত সাধারণত তার নির্ধারিত ভৌগোলিক সীমার বাইরের মামলা বিচার করতে পারে না। দেওয়ানী আদালত আইন, ১৮৮৭-এর ১৩ ধারা অনুযায়ী সরকার সরকারি গেজেটের মাধ্যমে আদালতের আঞ্চলিক সীমা নির্ধারণ বা পরিবর্তন করতে পারে। স্থাবর সম্পত্তি সংক্রান্ত মোকদ্দমার ক্ষেত্রে দেওয়ানী কার্যবিধির ১৬, ১৭ ও ১৮ ধারা বিশেষভাবে প্রযোজ্য।
(ক) যে স্থানে স্থাবর সম্পত্তি অবস্থিত, সেই
আদালতে মামলা (ধারা ১৬)
ধারা ১৬ অনুযায়ী, নিম্নোক্ত ধরনের মামলাগুলো সেই আদালতে দায়ের করতে হবে, যার স্থানীয় এখতিয়ারের মধ্যে বিরোধীয় স্থাবর সম্পত্তি অবস্থিত—
- স্থাবর সম্পত্তি পুনরুদ্ধার,
- সম্পত্তির বণ্টন,
- বন্ধক সংক্রান্ত অধিকার প্রয়োগ,
- স্থাবর সম্পত্তির অধিকার নির্ধারণ,
- আটক বা ক্রোককৃত অস্থাবর সম্পত্তি উদ্ধারের মামলা ইত্যাদি।
উদাহরণ
‘ক’ তার পৈতৃক সম্পত্তির বণ্টনের জন্য ‘খ’-এর বিরুদ্ধে মামলা করতে চায়। সম্পত্তিটি যশোরে অবস্থিত। অতএব, মামলাটি যশোর জেলার উপযুক্ত দেওয়ানী আদালতে দায়ের করতে হবে। এরপর মামলার মূল্যমান অনুযায়ী নির্ধারণ হবে সেটি সহকারী জজ, সিনিয়র সহকারী জজ নাকি জেলা জজ আদালতে দায়ের হবে।
(খ) সম্পত্তি একাধিক আদালতের এখতিয়ারে থাকলে
(ধারা ১৭)
যদি বিরোধীয় স্থাবর সম্পত্তি একাধিক
আদালতের আঞ্চলিক সীমার মধ্যে অবস্থিত হয়, তাহলে বাদী যেকোনো একটি আদালতে মামলা দায়ের
করতে পারবেন।
উদাহরণ
বিরোধীয় সম্পত্তির একটি অংশ ঢাকায় এবং অপর অংশ যশোরে অবস্থিত। এক্ষেত্রে বাদী ঢাকা অথবা যশোর—যে কোনো একটি উপযুক্ত আদালতে মামলা দায়ের করতে পারবেন।
(গ) আদালতের এখতিয়ার অনিশ্চিত হলে (ধারা ১৮)
কখনো কখনো সম্পত্তিটি কোন আদালতের আঞ্চলিক সীমার মধ্যে পড়ে, তা নিয়ে প্রকৃত অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। এ অবস্থায় বাদী যেকোনো একটি আদালতে মামলা দায়ের করতে পারবেন। তবে আরজিতে অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে যে আদালতের স্থানীয় এখতিয়ার সম্পর্কে বাস্তবিক অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ধারা ১৭ ও ১৮-এর
পার্থক্য
- ধারা ১৭: সম্পত্তি একাধিক আদালতের সীমার মধ্যে অবস্থিত, কিন্তু আদালতের এখতিয়ার নিশ্চিত।
- ধারা ১৮: কোন আদালতের স্থানীয় এখতিয়ার রয়েছে, সেটিই অনিশ্চিত।
৩. ব্যক্তি বা অস্থাবর সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ
সংক্রান্ত মামলা (ধারা ১৯)
ধারা ১৯ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা অস্থাবর সম্পত্তির ক্ষতির জন্য মামলা এমন পরিস্থিতিতে দায়ের করা যাবে—
- যেখানে ক্ষতি সংঘটিত হয়েছে; অথবা
- যেখানে বিবাদী বসবাস করে, ব্যবসা পরিচালনা করে কিংবা ব্যক্তিগত লাভের উদ্দেশ্যে কাজ করে।
উদাহরণ
‘এ’ চট্টগ্রামে বসবাস করে এবং ঢাকায় ‘বি’-কে মারধর করে। এক্ষেত্রে ‘বি’ চাইলে ঢাকায় (যেখানে ক্ষতি হয়েছে) অথবা চট্টগ্রামে (যেখানে বিবাদী বসবাস করে) ক্ষতিপূরণের মামলা করতে পারবেন।
৪. দেওয়ানী কার্যবিধির
২০ ধারার বিধান
ধারা ২০ হলো একটি সাধারণ বিধান (General Rule)। যেসব মামলা ধারা ১৬, ১৭, ১৮ বা ১৯-এর আওতায় পড়ে না, সেসব ক্ষেত্রে ধারা ২০ প্রযোজ্য হয়। ধারা ২০ অনুযায়ী মামলা নিম্নলিখিত যে কোনো স্থানে দায়ের করা যাবে—
(ক) বিবাদীর অবস্থান
যেখানে বিবাদী—
- বসবাস করে,
- ব্যবসা পরিচালনা করে, অথবা
- ব্যক্তিগত লাভের জন্য কাজ করে।
(খ) Cause of Action-এর স্থান
যেখানে মোকদ্দমার কারণ (Cause of
Action) সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে সৃষ্টি হয়েছে।
(গ) একাধিক বিবাদী থাকলে
যদি একাধিক বিবাদী থাকে, তবে তাদের মধ্যে যে কোনো একজন যেখানে বসবাস বা ব্যবসা করেন, সেখানে মামলা দায়ের করা যেতে পারে। তবে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতি অথবা অন্য বিবাদীদের সম্মতি প্রযোজ্য হবে।
ধারা ২০-এর উদাহরণ
‘এ’ ঢাকার ব্যবসায়ী এবং ‘বি’ চট্টগ্রামের
ব্যবসায়ী।
‘বি’ ঢাকায় অবস্থানরত তার এজেন্টের মাধ্যমে ‘এ’-এর কাছ থেকে পণ্য ক্রয় করে
এবং ঢাকায় ডেলিভারির নির্দেশ দেয়। ‘এ’ সেই অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করে, কিন্তু ‘বি’ মূল্য
পরিশোধ করে না।
এ অবস্থায় ‘এ’ মামলা করতে পারবেন—
- ঢাকায়, কারণ এখানেই Cause of Action-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সৃষ্টি হয়েছে; অথবা
- চট্টগ্রামে, কারণ বিবাদী সেখানে বসবাস ও ব্যবসা পরিচালনা করেন।
উপসংহার
দেওয়ানী মোকদ্দমা দায়েরের
ক্ষেত্রে আদালতের আর্থিক এখতিয়ার, আঞ্চলিক এখতিয়ার এবং মোকদ্দমার প্রকৃতি—এই তিনটি
বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেওয়ানী কার্যবিধির ১৫–২০ ধারা এসব বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ
কাঠামো প্রদান করেছে।
সংক্ষেপে—
- ধারা ১৫ → সর্বনিম্ন ক্ষমতাসম্পন্ন আদালতে মামলা।
- ধারা ১৬ → স্থাবর সম্পত্তি যেখানে অবস্থিত।
- ধারা ১৭ → সম্পত্তি একাধিক আদালতের এলাকায় হলে।
- ধারা ১৮ → আদালতের এখতিয়ার অনিশ্চিত হলে।
- ধারা ১৯ → ব্যক্তি বা অস্থাবর সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ।
- ধারা ২০ → অন্যান্য সব দেওয়ানী মোকদ্দমার সাধারণ বিধান।
এ কারণে কোনো দেওয়ানী
মামলা দায়েরের পূর্বে সংশ্লিষ্ট আদালতের আর্থিক ও আঞ্চলিক এখতিয়ার যথাযথভাবে যাচাই
করা অপরিহার্য।

0 Comments