প্রমাণের দায়িত্ব ও Plea of Alibi :The Evidence Act, 1872
প্রশ্ন: প্রমাণের দায়িত্ব বলতে কী বুঝেন? এটি কি ফৌজদারি মামলায় সমভাবে প্রযোজ্য? একটা ফৌজদারি মামলায় কোনো আসামী যদি ঘটনাস্থলে অনুপস্থিতির ওজর (plea of alibi) তোলে তাহলে এটি প্রমাণের দায়িত্ব কার? উদাহরণসহ The Evidence Act, 1872-এর সংশ্লিষ্ট ধারা উল্লেখ করে আলোচনা করুন।
উত্তর
প্রমাণের দায়িত্ব(Burden of Proof)
কোনো তথ্য বা দাবির সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য কোন পক্ষকে আদালতের সামনে প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে, সেই আইনগত বাধ্যবাধকতাকে 'প্রমাণের দায়িত্ব' (Burden of Proof) বলে। The Evidence Act, 1872-এর Section 101 অনুযায়ী, যে ব্যক্তি কোনো আইনগত অধিকার বা দায়ের অস্তিত্ব দাবি করে আদালতের কাছে রায় চান, সেই তথ্যগুলো প্রমাণ করার দায়িত্ব তারই অর্থাৎ 'যিনি দাবি করেন, তিনিই প্রমাণ করবেন' (he who asserts must prove)। Section 102-এ এর একটি ব্যবহারিক পরীক্ষা দেওয়া হয়েছে, কোনো পক্ষ যদি প্রমাণ উপস্থাপন না করে, তাহলে যে পক্ষ মামলায় হেরে যাবে, প্রমাণের দায়িত্ব তারই উপর বর্তায়। সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ১০১ থেকে ১১৪-এ ধারায় এ সংক্রান্ত সাধারণ ও বিশেষ অনুশাসনসমূহ আলোচনা করা হয়েছে।
এটি কি ফৌজদারি মামলায় সমভাবে প্রযোজ্য?
না, সম্পূর্ণ সমভাবে নয়, মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। দেওয়ানি
মামলায় প্রমাণের দায়িত্ব সাধারণত পক্ষে পক্ষে স্থানান্তরিত হতে পারে (shifting
burden), এবং মান হলো 'সম্ভাব্যতার প্রাধান্য' (preponderance of probability)। কিন্তু
ফৌজদারি মামলায় অভিযোগ প্রমাণের সামগ্রিক দায়িত্ব (legal/persuasive burden) সর্বদা
রাষ্ট্রপক্ষ/প্রসিকিউশনের উপরই থাকে এবং তা 'সন্দেহাতীতভাবে' (beyond reasonable
doubt) প্রমাণ করতে হয়।এই দায়িত্ব কখনোই আসামির উপর বর্তায় না, বিচারের কোনো পর্যায়েই
না। তবে Section 105-এর অধীনে, আসামি যদি Penal Code-এর কোনো General Exception (যেমন
আত্মরক্ষা, পাগলামি) দাবি করেন, তাহলে সেই নির্দিষ্ট ব্যতিক্রমের অস্তিত্ব প্রমাণের
একটি সীমিত দায়িত্ব (evidential burden) আসামির উপর বর্তায়। আদালত এরূপ পরিস্থিতির
অনুপস্থিতি অনুমান করবেন যতক্ষণ না আসামি তা খণ্ডন করেন।
Plea of Alibi প্রমাণের দায়িত্ব কার?
Alibi (অনুপস্থিতির ওজর) হলো আসামির এই দাবি যে, ঘটনার সময়
তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না, বরং অন্য কোথাও ছিলেন। ফলে তার পক্ষে অপরাধ সংঘটন সম্ভব
ছিল না।
প্রাসঙ্গিক ধারা
- Section 11 এই ধারা অনুযায়ী, যে তথ্য বিচার্য বিষয়ের (fact in issue) সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ (inconsistent), তা প্রাসঙ্গিক তথ্য হিসেবে গণ্য হয়। অ্যালিবাই একটি Section 11-ভিত্তিক প্রতিরক্ষা। কারণ আসামি ঘটনাস্থলের বাইরে অন্য কোথাও থাকার তথ্য দিয়ে 'সে অপরাধ করেছে' এই বিচার্য বিষয়টিকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রমাণ করার চেষ্টা করেন।
- Section 103 এই ধারাই মূলত অ্যালিবাই-এর ক্ষেত্রে প্রমাণের দায়িত্ব নির্ধারণ করে। স্বয়ং আইনের মূল টেক্সটেই একটি অ্যালিবাই-সদৃশ দৃষ্টান্ত রয়েছে: 'A prosecutes B for theft... B wishes the Court to believe that, at the time in question, he was elsewhere. He must prove it.' অর্থাৎ, আসামি যদি দাবি করেন যে ঘটনার সময় তিনি অন্য কোথাও ছিলেন, তাহলে সেই নির্দিষ্ট তথ্যটি প্রমাণের দায়িত্ব আসামির নিজের উপরই বর্তায়।
- Section 106 যখন কোনো তথ্য বিশেষভাবে কোনো ব্যক্তির নিজস্ব জ্ঞানের মধ্যে থাকে (especially within his knowledge), তখন সেই তথ্য প্রমাণের দায়িত্ব তারই উপর বর্তায়। আসামি ঘটনার সময় কোথায় ছিলেন। এই তথ্য স্বাভাবিকভাবেই তার নিজস্ব জ্ঞানের মধ্যে থাকে, তাই বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট অ্যালিবাই মামলায় Section 103-এর পাশাপাশি Section 106-ও একত্রে প্রয়োগ করে থাকেন ।
কতটা প্রমাণ করতে হবে
এখানে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য কাজ করে।
আসামির অ্যালিবাই প্রমাণের দায়িত্ব 'সন্দেহাতীতভাবে' (beyond reasonable doubt) নয় বরং সম্ভাব্যতার প্রাধান্যের ভিত্তিতে (on the balance of probabilities) প্রমাণ
করলেই যথেষ্ট। তবে আসামির এই দায়িত্ব হালকা নয় তাকে এমনভাবে প্রমাণ করতে হবে যাতে
ঘটনাস্থলে তার উপস্থিতির সম্ভাবনা কার্যত বাদ পড়ে যায়। বাংলাদেশ আপিল বিভাগ Md.
Nasir Ahmed vs State, 42 DLR 89 মামলায় স্পষ্টভাবে বলেন অ্যালিবাই প্রমাণের দায়িত্ব
আসামির উপর বর্তালেও, এই দায়িত্ব প্রসিকিউশনের দায়িত্বের চেয়ে কিছুটা হালকা
(somewhat lighter); আসামি যদি এমন পরিস্থিতির অস্তিত্ব সম্পর্কে আদালতের মনে একটি
যুক্তিসঙ্গত বিশ্বাস (reasonable belief) সৃষ্টি করতে সক্ষম হন, তাহলে তিনি তার দায়িত্ব
পালন করেছেন বলে গণ্য হবে যেখানে প্রসিকিউশনকে অবশ্যই আসামির অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে
প্রতিষ্ঠা করতে হয়।
একটি পুরোনো ফৌজদারি আপিল মামলায় (Criminal Appeal No. 39-40 of 2013) আপিল বিভাগ Wills' Circumstantial Evidence গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত করে বলেন - অ্যালিবাই প্রমাণ করতে হলে তা ঘটনার সমগ্র সময়কাল আচ্ছাদিত করতে হবে, যাতে আসামির পক্ষে অপরাধ সংঘটন সম্পূর্ণরূপে অসম্ভব প্রতীয়মান হয় - শুধু তার অপরাধ 'অসম্ভাব্য' মনে হওয়াই যথেষ্ট নয়। একই মামলায় আদালত পুনর্ব্যক্ত করেন যে, অ্যালিবাই প্রমাণে ব্যর্থ হলেও তার দ্বারা প্রসিকিউশনের সন্দেহাতীত-প্রমাণের মূল দায়িত্ব কমে যায় না - বরং প্রসিকিউশনকে স্বাধীনভাবে তার মামলা প্রতিষ্ঠা করতেই হবে।
ধরা যাক, ক-কে খ হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে, ঘটনাটি
১০ জানুয়ারি রাত ৯টায় ঢাকায় ঘটেছে বলে অভিযোগ। ক দাবি করেন যে, ওই সময় তিনি চট্টগ্রামে
তার বোনের বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে
হবে যে ক-ই খ-কে হত্যা করেছে; আর ক-কে (Section 103 ও 106 অনুযায়ী) প্রমাণ করতে হবে
যে তিনি প্রকৃতপক্ষে ওই সময় চট্টগ্রামে ছিলেন , এর জন্য তিনি বিয়ের কার্ড, সাক্ষী,
ছবি, ভ্রমণের টিকিট ইত্যাদি প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন। যদি এই প্রমাণ বিশ্বাসযোগ্য
মনে হয় এবং আদালতের মনে যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ তৈরি করে যে ক আদৌ ঢাকায় উপস্থিত ছিলেন
কিনা, তাহলে রাষ্ট্রপক্ষের মামলা ব্যর্থ হবে এবং ক খালাস পাবেন।
উপসংহার
সাধারণ প্রমাণের দায়িত্ব (Section 101) ও নির্দিষ্ট তথ্যের
প্রমাণের দায়িত্ব (Section 103) উভয়ই ফৌজদারি মামলায় প্রযোজ্য হলেও, রাষ্ট্রপক্ষের
সামগ্রিক সন্দেহাতীত-প্রমাণের দায়িত্ব কখনো আসামির উপর বর্তায় না। অ্যালিবাই-এর ক্ষেত্রে
শুধু 'আসামি ঘটনাস্থলে ছিলেন না' এই নির্দিষ্ট তথ্যটুকু প্রমাণের দায়িত্ব
(Section 103 ও 106, Section 11-এর সাথে পাঠ করে) আসামির উপর বর্তায়, তাও সম্ভাব্যতার
প্রাধান্যের ভিত্তিতে সন্দেহাতীতভাবে নয়।
প্রাসঙ্গিক নজির
|
মামলা |
ধারা |
নীতি |
|
Md.
Nasir Ahmed vs State, 42 DLR 89 |
103,
106 |
স্ত্রী-হত্যা
মামলায় অ্যালিবাই প্রমাণের দায়িত্ব আসামির উপর, তবে তা প্রসিকিউশনের দায়িত্বের
চেয়ে হালকা, আসামি যুক্তিসঙ্গত বিশ্বাস সৃষ্টি করলেই যথেষ্ট |
|
Criminal
Appeal No. 39-40 of 2013, আপিল বিভাগ |
11,
103 |
অ্যালিবাই
সমগ্র ঘটনাকাল আচ্ছাদন করতে হবে; ব্যর্থ হলেও প্রসিকিউশনের মূল দায়িত্ব হ্রাস পায়
না |
|
Ajufannessa
@ Aji Bibi and Others vs Safar Miah and Others, 30 DLR (AD) 41 (1978) |
101,
102, 103, 105 |
প্রমাণের
দায়িত্ব সংক্রান্ত সাধারণ নীতি প্রতিষ্ঠাকারী নজির |
|
Abul
Kashem vs State, 42 DLR 37 |
101–105 |
ফৌজদারি
মামলায় প্রমাণের দায়িত্বের সাধারণ প্রয়োগ |
|
Shah
Sufi Taj Islam vs Begum Rokeya Chowdhury & Another, 9 BLT (AD) 62 |
101–105 |
প্রমাণের
দায়িত্ব ও onus সংক্রান্ত নীতি |

0 Comments