প্রবেট (Probate) আসলে কী?
The Succession Act, 1925-এর Section 2(f) অনুযায়ী, 'Probate' অর্থ হলো উইলের
একটি অনুলিপি, যা সক্ষম এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতের সিলমোহরযুক্ত, উইলের নির্বাহক
(executor)-কে উইলের এস্টেট পরিচালনার এখতিয়ার প্রদানপূর্বক প্রত্যয়িত করে। সহজ ভাষায়,
প্রবেট হলো আদালতের একটি সিদ্ধান্ত যার মাধ্যমে ঘোষণা করা হয় যে, মৃত ব্যক্তির উইলটি
প্রকৃত ও বৈধ, এবং উইলে উল্লেখিত নির্বাহক ব্যক্তিই এস্টেট পরিচালনার আইনগত অধিকারী।
প্রবেট ছাড়া উইলের নির্বাহক ব্যাংক থেকে টাকা তোলা, জমি হস্তান্তর বা রেজিস্ট্রেশন,
বা মৃত ব্যক্তির নামে থাকা কোনো সম্পত্তি নিয়ে আইনগতভাবে কাজ করতে পারেন না ,অন্তত
যেসব ক্ষেত্রে প্রবেট বাধ্যতামূলক, সেখানে।
Probate-এর উদ্দেশ্য (Objects of Probate)
Probate-এর প্রধান উদ্দেশ্যগুলো হলো:
- উইল যথাযথভাবে সম্পাদিত হয়েছে কি না, তা বিচারিকভাবে যাচাই করা।
- মৃত ব্যক্তির শেষ Will-এর যথার্থতা প্রতিষ্ঠা করা।
- উইলে নিযুক্ত Executor-এর আইনগত কর্তৃত্ব নিশ্চিত করা।
- মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি আইনানুগভাবে পরিচালনা ও বণ্টনের ব্যবস্থা করা।
- উইল নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে বিচারিক নিষ্পত্তির সুযোগ সৃষ্টি করা।
- মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও আইনগত নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠা করা।
Probate ও Will-এর সম্পর্ক
Will এবং Probate এক বিষয় নয়। Will হলো Testator-এর মৃত্যুর পর কার্যকর হওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি সম্পত্তি-সংক্রান্ত ঘোষণা। অন্যদিকে, Probate হলো আদালতের মাধ্যমে সেই Will-এর যথার্থতা প্রমাণ ও Executor-এর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া।
উদাহরণস্বরূপ, A তাঁর সম্পত্তি সম্পর্কে একটি উইল করে B-কে Executor নিযুক্ত করলেন। A-এর মৃত্যুর পর B যদি সেই উইল কার্যকর করার জন্য আদালতের Probate গ্রহণ করেন, তাহলে আদালতের স্বীকৃতির মাধ্যমে B-এর Executor হিসেবে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
তবে উইল থাকা এবং Probate পাওয়া, দুটিকে একই ঘটনা হিসেবে দেখা যাবে না।
- নির্দিষ্ট স্থায়ী বাসস্থান (Fixed Place of Abode), অথবা
- স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি (Movable or Immovable Property)
- আদালতের এখতিয়ারের মধ্যে থাকলে Probate মঞ্জুরের আবেদন করা যেতে পারে।
কোথায় আবেদন করতে হবে?
এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো — জেলা জজ আদালতে (District Judge's Court)।
The Succession Act, 1925-এর Section 264 অনুযায়ী, জেলা জজের নিজ জেলার মধ্যে সকল
ক্ষেত্রে প্রবেট ও লেটার্স অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন মঞ্জুর ও বাতিল করার এখতিয়ার রয়েছে।
তবে প্রশ্ন থেকে যায় — কোন জেলার জজ আদালতে?
কোন জেলার আদালতে আবেদন করবেন -নির্ধারণী
নিয়ম
এই বিষয়ে সাধারণ নিয়ম হলো:
- মৃত ব্যক্তি মৃত্যুকালে যে জেলায় সাধারণত বসবাস করতেন (ordinarily resided), সেই জেলার জেলা জজ আদালতে আবেদন করতে হবে।
- যদি মৃত ব্যক্তির কোনো নির্দিষ্ট স্থায়ী বসবাসস্থল না থাকে, তাহলে যে জেলায় তার সম্পত্তির কোনো অংশ পাওয়া যায়, সেই জেলার জেলা জজ আদালতে আবেদন করা যাবে।
এই নীতিটি মূলত Succession Certificate সংক্রান্ত Section 371-এ স্পষ্টভাবে লেখা
থাকলেও, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট প্রবেট মামলাতেও অভিন্ন নীতি প্রয়োগ করেছেন। Gour
Chandra Saha vs The Vice Chairman, (1969) 21 DLR 535 মামলায় সিদ্ধান্ত হয় যে, উইল
সম্পাদনকারী ব্যক্তির নির্দিষ্ট বাসস্থান বা সম্পত্তি যে জেলা জজের এখতিয়ারভুক্ত এলাকায়
ছিল, সেই জেলা জজই প্রবেট প্রদান করতে পারবেন।
'সাধারণত বসবাস' মানে কী ঃ একটি গুরুত্বপূর্ণ
ব্যাখ্যা
এখানে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য লক্ষ করা দরকার — আইনে বলা আছে 'ordinarily resided' (সাধারণত বসবাস), 'permanently resided' (স্থায়ীভাবে বসবাস) নয়। Ummida Khan vs Salahuddin Khan, 37 DLR 117 মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ ব্যাখ্যা করেন যে, কোনো ব্যক্তির স্থায়ী ঠিকানা ঢাকায় থাকলেও, মৃত্যুর সময় তিনি যদি ব্যবসায়িক কারণে অন্য কোনো জেলায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে থাকেন এবং সেখানেই মারা যান, তাহলে সেই জেলার আদালতই এখতিয়ারসম্পন্ন হবে — স্থায়ী ঠিকানার জেলা নয়।
N.B: প্রবেট আবেদনের আগে মৃত ব্যক্তির মৃত্যুকালীন প্রকৃত ঠিকানা (শুধু জাতীয় পরিচয়পত্রের ঠিকানা নয়) যাচাই করে সঠিক জেলা জজ আদালত নির্ধারণ করা জরুরি। ভুল আদালতে আবেদন করলে এখতিয়ার-সংক্রান্ত আপত্তিতে মামলা বিলম্বিত হতে পারে।
প্রবেট কখন বাধ্যতামূলক, কখন
ঐচ্ছিক?
The Succession Act, 1925-এর Section 57 অনুযায়ী, হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ বা জৈন
ধর্মাবলম্বী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রবেট বাধ্যতামূলক, যদি: (ক) উইলটি ঢাকা বা চট্টগ্রামের
মতো সাবেক প্রেসিডেন্সি এলাকার সাধারণ মূল দেওয়ানি এখতিয়ারের (ordinary original
civil jurisdiction) সীমানার মধ্যে সম্পাদিত হয়ে থাকে, অথবা (খ) উইলটি ওই সীমানার
বাইরে সম্পাদিত হলেও তাতে বর্ণিত স্থাবর সম্পত্তি ওই সীমানার মধ্যে অবস্থিত হয়। মুসলিম
ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রবেট সাধারণত বাধ্যতামূলক নয় — তবে ব্যবহারিক কারণে (যেমন ব্যাংক,
রেজিস্ট্রি অফিস কর্তৃপক্ষের কাছে উইলের সত্যতা প্রমাণ করা, বা উত্তরাধিকারীদের মধ্যে
সম্ভাব্য বিরোধ এড়ানো) মুসলিমরাও প্রায়শই স্বেচ্ছায় প্রবেট বা Letters of
Administration নিয়ে থাকেন।
সংক্ষিপ্ত প্রক্রিয়াঃ কী কী
ধাপ পার হতে হয়
১. সংশ্লিষ্ট জেলা জজ আদালতে আইনজীবীর মাধ্যমে
দরখাস্ত (Petition) দাখিল — সাথে মূল উইল, মৃত্যু সনদ, উত্তরাধিকারীদের তালিকা সংযুক্ত
করতে হয়।
২. সম্পত্তির মূল্যের ভিত্তিতে Court Fees
Act অনুযায়ী নির্ধারিত অ্যাড-ভ্যালোরেম কোর্ট ফি জমা দিতে হয়।
৩. আদালত সংশ্লিষ্ট উত্তরাধিকারী ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট
ব্যক্তিদের নোটিশ/সমন জারি করেন, যাতে কারও আপত্তি থাকলে তা জানানোর সুযোগ পান।
৪. কোনো আপত্তি না থাকলে (non-contentious) সংক্ষিপ্ত
শুনানির মাধ্যমে প্রবেট মঞ্জুর হয়; আপত্তি থাকলে (contentious) তা একটি নিয়মিত মামলার
মতো বিচারের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়।
5. আদালত সন্তুষ্ট হলে সিলমোহরযুক্ত প্রবেট সনদ
প্রদান করেন, যা নির্বাহকের এস্টেট পরিচালনার আইনগত ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
মনে রাখার মতো আরও কিছু নীতি
- প্রবেট প্রদানের কার্যক্রমে সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয় না — মালিকানা-বিরোধ থাকলে তা পৃথক টাইটেল স্যুটে (Title Suit) নিষ্পত্তি করতে হয়, প্রবেট কার্যক্রমে নয় (Md Jalil Ansari vs Surendra Nath Basu, (1969) 21 DLR 331)।
- এস্টেটে কোনো স্বার্থ নেই এমন ব্যক্তি প্রবেট কার্যক্রমে পক্ষ হওয়ার দাবি করতে পারেন না।
- জেলা জজের প্রবেট-সংক্রান্ত যে কোনো আদেশ (এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশও) আপিলযোগ্য — সরাসরি রিভিশন আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় (Anuj Choudhury and others vs Sailendra Kishore Chowdhury and others, 51 DLR 460)।
উপসংহার
উপসংহারে বলা যায় যে, প্রবেটের জন্য সঠিক ঠিকানা হলো মৃত ব্যক্তির মৃত্যুকালীন
বসবাসস্থল যে জেলায়, সেই জেলার জেলা জজ আদালত; আর নির্দিষ্ট বসবাসস্থল না থাকলে, সম্পত্তি
যে জেলায় অবস্থিত সেই জেলার জেলা জজ আদালত। এই এখতিয়ারগত নিয়মটি সঠিকভাবে বোঝা ও
প্রয়োগ করা প্রবেট প্রক্রিয়ার প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ।ভুল আদালতে আবেদন
দাখিল করলে শুরুতেই মামলা জটিলতার মুখে পড়তে পারে।
%20%E0%A6%86%E0%A6%87%E0%A6%A8.jpg)
0 Comments