সর্বশেষ

6/recent/ticker-posts

হিন্দু বিবাহ ও দায়ভাগ মতে নারীর উত্তরাধিকার-ভরণপোষণ অধিকার(Hindu Marriage Dayabhaga Women Rights)

 

Hindu Marriage Dayabhaga Women Rights

হিন্দু বিবাহ ও দায়ভাগ মতে নারীর উত্তরাধিকার-ভরণপোষণ অধিকার


প্রশ্ন: 'হিন্দু বিবাহ একটি চুক্তি নয় বরং ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা' ব্যাখ্যা করুন। হিন্দু আইনের দায়ভাগ মতবাদ অনুসারে বিবাহের পর উত্তরাধিকার ও ভরণপোষণের অধিকার বিষয়ে একজন মহিলার অবস্থান কী হবে?

১. হিন্দু বিবাহ একটি চুক্তি নয়, বরং ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা

হিন্দু আইনে বিবাহকে ইসলামি আইনের মতো একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি (contract) হিসেবে গণ্য করা হয় না — বরং এটি একটি সংস্কার (Sacrament), যা হিন্দু ধর্মীয় দর্শনে ষোলটি সংস্কারের অন্যতম একটি পবিত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হয়। এই পার্থক্যের মূল কারণগুলো নিম্নরূপ:

  • সম্মতির ভূমিকা — চুক্তিতে উভয় পক্ষের স্বাধীন সম্মতি অপরিহার্য শর্ত; কিন্তু ঐতিহ্যগত হিন্দু আইনে বিবাহ হলো কন্যাদান, পিতা কর্তৃক কন্যাকে বরের হাতে ধর্মীয় দান হিসেবে অর্পণ করা।
  • উদ্দেশ্য — চুক্তির উদ্দেশ্য পারস্পরিক স্বার্থ পূরণ; কিন্তু বিবাহের ধর্মীয় উদ্দেশ্য হলো ধর্ম, অর্থ ও কাম পালন এবং পুত্রসন্তান লাভের মাধ্যমে পূর্বপুরুষদের প্রতি 'পিণ্ডদান' কর্তব্য অব্যাহত রাখা।
  • বিলুপ্তিযোগ্যতা — একটি চুক্তি পক্ষগণের সম্মতিতে বাতিল বা বিলুপ্ত করা যায়; কিন্তু ঐতিহ্যগত হিন্দু বিবাহ অবিচ্ছেদ্য ও চিরস্থায়ী বলে গণ্য হতো।
  • আইনি প্রতিকার — চুক্তি ভঙ্গ হলে প্রতিকার হিসেবে ক্ষতিপূরণ বা সুনির্দিষ্ট পালনের মামলা করা যায়; কিন্তু হিন্দু আইনে ঐতিহ্যগতভাবে বিবাহবিচ্ছেদের কোনো বিধানই ছিল না।

এই কারণেই বলা হয় যে, হিন্দু বিবাহ হলো একটি অপরিবর্তনীয়, পবিত্র ও ধর্মীয় কর্তব্য, যা পক্ষগণের ইচ্ছাধীন কোনো লেনদেন নয়।

২. দায়ভাগ মতবাদ অনুসারে বিবাহের পর নারীর উত্তরাধিকার ও ভরণপোষণের অধিকার

বাংলাদেশে প্রচলিত হিন্দু আইন মূলত দায়ভাগ মতবাদ অনুসরণ করে (যা বঙ্গদেশে জীমূতবাহন কর্তৃক প্রবর্তিত, এবং ভারতের অধিকাংশ অঞ্চলে প্রচলিত মিতাক্ষরা মতবাদ থেকে ভিন্ন)।

ক) উত্তরাধিকার সংক্রান্ত অবস্থান

মৌলিক নিয়ম — দায়ভাগ মতে, কোনো পুরুষের মৃত্যুর পর তার সম্পত্তির প্রথম উত্তরাধিকারী হন জীবিত পুত্র বা পুত্রগণ। নারীদের এখানে সম্পত্তিতে কোনো জন্মসূত্রে স্বত্ব (right by birth) নেই।

বিধবা স্ত্রীর অবস্থান — Hindu Women's Rights to Property Act, 1937 পাসের আগে, পুত্র বা পৌত্র জীবিত থাকলে বিধবা স্ত্রী কোনো উত্তরাধিকার পেতেন না। এই আইন পাসের পর এখন স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা স্ত্রী পুত্রের সমান অংশ পান, তবে তা পূর্ণাঙ্গ মালিকানাস্বত্ব নয়, বরং জীবনস্বত্ব (limited/life interest) — তার মৃত্যুর পর সেই অংশ পুনরায় স্বামীর বংশধরদের মধ্যে বণ্টিত হয়।

কন্যার অবস্থান (স্ত্রীধন প্রসঙ্গে) — কন্যা তার মায়ের স্ত্রীধন (Stridhan) উত্তরাধিকারসূত্রে পেলে তার প্রকৃতি কী হবে, তা নিয়ে ঐতিহাসিকভাবে বিতর্ক ছিল, এই বিষয়ে ২০২২ সালে একটি যুগান্তকারী রায় এসেছে।

বোনের অবস্থান — দায়ভাগ মতে বোন 'সপিণ্ড' (সমপিণ্ডভোগী আত্মীয়) হিসেবে গণ্য হন না বিধায়, ভাইয়ের মৃত্যুর পর তিনি সাধারণত সম্পত্তিতে অংশ পান না।

খ) ভরণপোষণ সংক্রান্ত অবস্থান

  • বিবাহিতা স্ত্রী স্বামীর নিকট থেকে ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারী- এটি হিন্দু ধর্মীয় আইনে স্বামীর একটি মৌলিক কর্তব্য হিসেবে স্বীকৃত।
  • Hindu Married Women's Right to Separate Residence and Maintenance Act, 1946 অনুযায়ী, কতিপয় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে (স্বামীর নিষ্ঠুরতা, পরিত্যাগ, কুষ্ঠরোগ, অন্যত্র বিবাহ, ধর্মান্তর ইত্যাদি) স্ত্রী পৃথক বাসস্থান ও ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন।
  • স্ত্রীধন- স্ত্রী বিবাহ-উপহার, উপার্জন বা অন্য যেকোনো সূত্রে অর্জিত সম্পত্তির উপর তার সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত মালিকানাস্বত্ব থাকে- এটি তার একক ব্যক্তিগত সম্পত্তি।

৩. ২০২২ সালের যুগান্তকারী রায় - নারীর উত্তরাধিকারে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি 

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ Mrigangka Mohan Dhali and others vs Chitta Ranjan Mondol and others, Civil Appeal No. 55 of 2003 মামলায় (রায় প্রদান: ১১ ডিসেম্বর ২০২২) দায়ভাগ মতে নারীর উত্তরাধিকার সংক্রান্ত একটি দীর্ঘদিনের অস্পষ্টতা নিরসন করেন  যা এই বিষয়ে সবচেয়ে সাম্প্রতিক ও কর্তৃত্বপূর্ণ নজির।

মামলার প্রেক্ষাপট

রুক্ষিণী দাসী তার স্ত্রীধন তহবিল থেকে অর্জিত সম্পত্তি রেখে মারা যান, যা তার একমাত্র কন্যা হাজারী সুন্দরী দাসী উত্তরাধিকারসূত্রে পান। হাজারী সুন্দরীর মৃত্যুর পর তার একমাত্র কন্যা এলোকেশী মন্ডল এই সম্পত্তি দাবি করেন। বিবাদীপক্ষের যুক্তি ছিল - ঔপনিবেশিক আমলের প্রিভি কাউন্সিল নজির Sheo Shankar Lal vs Debi Sahai, (1903) 30 I.A. 202 এবং D.F. Mulla-র 'Principles of Hindu Law' গ্রন্থ অনুযায়ী, কোনো নারী যখন অন্য নারীর কাছ থেকে সম্পত্তি উত্তরাধিকারসূত্রে পান, তখন তিনি শুধু সীমিত স্বত্ব (limited interest) পান- পূর্ণাঙ্গ মালিকানা নয় এবং তার মৃত্যুর পর সেই সম্পত্তি তার নিজের উত্তরাধিকারীর কাছে না গিয়ে মূল স্ত্রীধন-মালিকের নিকটাত্মীয়দের কাছে ফিরে যাবে।

আদালতের সিদ্ধান্ত ও যুক্তি

আপিল বিভাগ (বিচারপতি বরহানউদ্দিনের নেতৃত্বে) জীমূতবাহনের মূল 'দায়ভাগ' গ্রন্থের চতুর্থ অধ্যায় সরাসরি পরীক্ষা করে সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে: 

  • মূল দায়ভাগ গ্রন্থের কোথাও বলা নেই যে কন্যা মায়ের স্ত্রীধন উত্তরাধিকারসূত্রে পেলে তা তার কাছে 'বিধবার স্বত্ব'-এর মতো সীমিত হয়ে যাবে, বরং পুত্র ও কন্যা 'সমানভাবে' (EQUALLY) উত্তরাধিকারী হন এই নীতির ভিত্তিতে কন্যা মায়ের স্ত্রীধন পুত্রের মতোই সম্পূর্ণ ও নিরঙ্কুশভাবে (absolutely) পাবেন।
  • Sheo Shankar Lal vs Debi Sahai এবং তার ভিত্তি Huri Doyal Singh Sarmana vs Girish Chunder Mukerjee, (1891) ILR 17 Cal 911- উভয় নজিরই মূলত দায়ভাগের ভুল অধ্যায় (বিধবার উত্তরাধিকার সংক্রান্ত একাদশ অধ্যায়) থেকে নীতি গ্রহণ করে স্ত্রীধন সংক্রান্ত চতুর্থ অধ্যায়ে প্রয়োগ করেছিল- তাই আদালত এই নজিরদ্বয়কে 'per incuriam' (অসতর্কতাবশত ভুলভাবে প্রদত্ত) ঘোষণা করে অবাধ্যতামূলক বলে রায় দেন।
  • আদালত সংবিধানের Article 27, Article 19(2)-(3) এবং Article 28(1)-(2) উল্লেখ করে বলেন যে, প্রাচীন ব্যাখ্যার দ্ব্যর্থতা দূর করার সময় আদালতকে অবশ্যই সংবিধানের সাম্যের চেতনা দ্বারা পরিচালিত হতে হবে।
  • আদালত এও স্পষ্ট করেন যে, 'Hindu Law of Inheritance (Amendment) Act, 1929' শুধুমাত্র মিতাক্ষরা মতবাদের অনুসারীদের জন্য প্রযোজ্য- দায়ভাগ-শাসিত বাংলাদেশে এই আইনের ভিত্তিতে দেওয়া পূর্ববর্তী আদালতসমূহের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল বলে চিহ্নিত করা হয়।
N.B:

এই রায়ের ফলে এখন স্পষ্ট যে, দায়ভাগ মতে কোনো নারী যখন তার মায়ের বা দিদিমার স্ত্রীধন উত্তরাধিকারসূত্রে পান, তখন তিনি তা সম্পূর্ণ ও নিরঙ্কুশ মালিকানাস্বত্বে (পুত্রের ন্যায়) পাবেন, সীমিত জীবনস্বত্বে নয়। এটি ভারতের ১৯৫৬ সালের Hindu Succession Act-এর Section 14-এর অনুরূপ নীতি অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক পদক্ষেপ, যদিও বাংলাদেশে এখনো কোনো সুসংহত কোডিফায়েড আইন প্রণীত হয়নি। তবে  এটি লক্ষণীয় যে, এই রায় কেবল স্ত্রীধন-থেকে-স্ত্রীধন উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; স্বামীর সম্পত্তিতে বিধবা স্ত্রীর অধিকার (Hindu Women's Rights to Property Act, 1937-এর অধীনে) এখনো জীবনস্বত্বভিত্তিক রয়ে গেছে-এই দুটি পরিস্থিতি গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।

পরীক্ষার কৌশলগত পরামর্শ: এই প্রশ্নের উত্তরে ঐতিহ্যগত নিয়ম (বিধবার জীবনস্বত্ব, কন্যার সীমিত অবস্থান) বর্ণনা করার পাশাপাশি এই ২০২২ সালের রায়ের উল্লেখ করলে উত্তরটি আদালতের সাম্প্রতিকতম অবস্থান প্রতিফলিত করবে এবং পরীক্ষকের কাছে উত্তরটি উল্লেখযোগ্যভাবে আলাদা ও হালনাগাদ মনে হবে।

৪. প্রাসঙ্গিক নজির ও বিধান 

বিধান/মামলা

প্রাসঙ্গিক বিষয়

Hindu Women's Rights to Property Act, 1937

বিধবা স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তিতে পুত্রের সমান অংশ পাবেন, তবে জীবনস্বত্বভিত্তিক

Hindu Married Women's Right to Separate Residence and Maintenance Act, 1946

নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্ত্রীর পৃথক বাসস্থান ও ভরণপোষণের অধিকার

Mrigangka Mohan Dhali and others vs Chitta Ranjan Mondol and others, Civil Appeal No. 55 of 2003 (AD, ১১ ডিসেম্বর ২০২২)

দায়ভাগ মতে কন্যা মায়ের স্ত্রীধন সম্পূর্ণ ও নিরঙ্কুশভাবে পাবেন- সীমিত স্বত্বে নয়; পুরনো প্রিভি কাউন্সিল নজির per incuriam ঘোষিত

Sheo Shankar Lal vs Debi Sahai, (1903) 30 I.A. 202 (প্রিভি কাউন্সিল)

পুরনো নীতি, নারী-থেকে-নারী উত্তরাধিকারে সীমিত স্বত্ব (২০২২ সালের রায়ে অবাধ্যতামূলক ঘোষিত)

Huri Doyal Singh Sarmana vs Girish Chunder Mukerjee, (1891) ILR 17 Cal 911

Sheo Shankar Lal মামলার ভিত্তি - ২০২২ সালের রায়ে একই কারণে অবাধ্যতামূলক ঘোষিত

Hindu Succession Act, 1956 (ভারত), Section 14 (তুলনামূলক)

ভারতে নারীর সম্পত্তিকে সরাসরি আইন দ্বারা সম্পূর্ণ মালিকানায় রূপান্তরিত করা হয়েছে- বাংলাদেশে অনুরূপ কোডিফিকেশন এখনো অনুপস্থিত

 


Post a Comment

0 Comments