সর্বশেষ

6/recent/ticker-posts

সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা অভিশংসন (Impeaching the Credit of a Witness)

 সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ১৪৫, ১৪৬, ১৫৪ ও ১৫৫ ধারার আলোকে সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা অভিশংসনের পদ্ধতি, জেরা, বৈরী সাক্ষী এবং প্রাসঙ্গিক বিচারিক নজির সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন।

How to impeach the credit of a witness?; What are the five basic methods of impeaching a witness?; What are the grounds for impeaching a witness?; Can someone impeach their own witness?; সাক্ষ্য আইন ১৮৭২ বাংলাদেশ pdf; সাক্ষ্য আইনের ৯০ ধারা; সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা কিভাবে হরণ করা যায়?; ১৫৫ ধারা কি?; সাক্ষ্য আইনে দলিল কত প্রকার?;

সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা কীভাবে অভিশংসন করা যায়? সংশ্লিষ্ট বিধানের আলোকে উত্তর দিন।

বিচারকালে কোনো সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে কি না, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সাক্ষ্যটির প্রাসঙ্গিকতা ও গ্রহণযোগ্যতার পাশাপাশি সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। একজন সাক্ষী আদালতে বক্তব্য দিলেই তাঁর প্রতিটি বক্তব্য সত্য বলে গ্রহণ করতে হয় না। তাঁর বক্তব্যের নির্ভরযোগ্যতা, নিরপেক্ষতা, সামঞ্জস্য এবং সত্য বলার প্রবণতা বিচারিক মূল্যায়নের বিষয়। আইনের ভাষায় সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা অভিশংসন (Impeaching the Credit of a Witness) বলতে আইনস্বীকৃত পদ্ধতিতে সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা বা তাঁর সাক্ষ্যের নির্ভরযোগ্যতা দুর্বল করাকে বোঝায়। এর উদ্দেশ্য ব্যক্তিগতভাবে কোনো সাক্ষীকে হেয় করা নয়; বরং আদালতকে দেখানো যে, সংশ্লিষ্ট সাক্ষীর বক্তব্যের ওপর নির্ভর করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে এ বিষয়ে প্রধান বিধান রয়েছে সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ (The Evidence Act, 1872)-এর ১৫৫ ধারায়। এর পাশাপাশি ১৪৫, ১৪৬, ১৪৮–১৫৪ ধারায় বর্ণিত বিধানগুলো সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই এবং অভিশংসনের পদ্ধতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

 সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা অভিশংসনের আইনগত ভিত্তি

সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ ধারায় সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা অভিশংসনের তিনটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো—

  • সাক্ষীর চরিত্র ও বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে পরিচিত ব্যক্তিদের সাক্ষ্য উপস্থাপন করা।
  • সাক্ষীর ঘুষ গ্রহণ, ঘুষের প্রস্তাব গ্রহণ অথবা সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য অন্য কোনো দুর্নীতিমূলক প্রলোভন গ্রহণের প্রমাণ উপস্থাপন করা।
  • সাক্ষীর বর্তমান সাক্ষ্যের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ তাঁর পূর্ববর্তী বক্তব্য প্রমাণ করা। ধারা ১৫৫ অনুযায়ী, সাধারণত প্রতিপক্ষ (Adverse Party) এসব পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারে। তবে যে পক্ষ সাক্ষীকে আদালতে হাজির করেছে, আদালতের সম্মতিক্রমে সেই পক্ষও সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা অভিশংসনের উদ্যোগ নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে ১৫৪ ধারার বিধানও বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।

 

সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা অভিশংসনের পদ্ধতিসমূহ--


ক. সাক্ষীর চরিত্র ও বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে অন্য সাক্ষীর মাধ্যমে প্রাসঙ্গিক বিধান: সাক্ষ্য আইনের ১৫৫(১) ধারা।

এই বিধান অনুসারে, এমন ব্যক্তিকে সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করা যায়, যিনি সংশ্লিষ্ট সাক্ষীকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন এবং তাঁর পরিচিতি বা আচরণ সম্পর্কে জ্ঞানের ভিত্তিতে তাঁকে অবিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করেন। উদাহরণস্বরূপ, একটি মামলায় ‘ক’ দাবি করলেন যে, তিনি ‘খ’-এর কাছে পণ্য সরবরাহ করেছেন। প্রতিপক্ষ এমন একজন ব্যক্তিকে সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করল, যিনি ‘ক’-কে দীর্ঘদিন ধরে চেনেন এবং তাঁর সত্যবাদিতা সম্পর্কে নেতিবাচক সাক্ষ্য দিলেন। এ ধরনের সাক্ষ্য আইনসম্মতভাবে ‘ক’-এর বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

তবে এখানে কয়েকটি বিষয় বিবেচ্য। প্রথমত, সাক্ষীকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিছক ব্যক্তিগত বিরোধ, অনুমান বা গুজবের ওপর ভিত্তি করে কাউকে অবিশ্বাসযোগ্য বললেই তা যথেষ্ট হবে না। তৃতীয়ত, সাক্ষ্য আইন নিজেই এ ধরনের সাক্ষ্যের বিশেষ সীমা নির্ধারণ করেছে।

 ১৫৫ ধারার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে অবিশ্বাসযোগ্য বলার কারণগুলো ওই সাক্ষী তাঁর জবানবন্দির শুরুতে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন না; তবে জেরায় তাঁকে সেসব কারণ সম্পর্কে প্রশ্ন করা যেতে পারে। তিনি জেরায় যে উত্তর দেবেন, তা কেবল ওই উত্তরের বিরোধিতা করার জন্য অন্য প্রমাণ দিয়ে খণ্ডন করা যায় না; যদিও উত্তর মিথ্যা হলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রশ্ন উঠতে পারে।


খ. ঘুষ বা দুর্নীতিমূলক প্রলোভন প্রমাণের মাধ্যমে প্রাসঙ্গিক বিধান: সাক্ষ্য আইনের ১৫৫(২) ধারা।

কোনো সাক্ষী সাক্ষ্য দেওয়ার উদ্দেশ্যে ঘুষ গ্রহণ করেছেন, ঘুষের প্রস্তাবে সম্মত হয়েছেন অথবা অন্য কোনো দুর্নীতিমূলক প্রলোভন গ্রহণ করেছেন বলে প্রমাণ করা গেলে তাঁর নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একটি ফৌজদারি মামলায় কোনো সাক্ষী অভিযুক্তের পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ উঠল। কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা অভিশংসিত হবে না। অর্থ লেনদেন, সংশ্লিষ্ট যোগাযোগ, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য বা অন্যান্য আইনসম্মত প্রমাণের মাধ্যমে প্রাসঙ্গিক তথ্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

এই পদ্ধতিতে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত, সাক্ষী কোনো অর্থ বা সুবিধা গ্রহণ করেছেন কি না। দ্বিতীয়ত, ওই অর্থ বা সুবিধার সঙ্গে আদালতে তাঁর সাক্ষ্য দেওয়ার কোনো দুর্নীতিমূলক সম্পর্ক রয়েছে কি না। দ্বিতীয় বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত না হলে শুধু অর্থ লেনদেনের ঘটনা দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাক্ষীর সাক্ষ্য অবিশ্বাস্য হয়ে যায় না। অতএব, এই পদ্ধতির মূল লক্ষ্য হলো সাক্ষীর বক্তব্যের পেছনে কোনো অবৈধ প্রভাব, স্বার্থ বা প্রলোভন কাজ করেছে কি না, তা আদালতের সামনে প্রমাণসহ তুলে ধরা।



গ. পূর্ববর্তী অসংগত বক্তব্যের মাধ্যমে প্রাসঙ্গিক বিধান: সাক্ষ্য আইনের ১৫৫(৩) ধারা ও ১৪৫ ধারা।

সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা অভিশংসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিগুলোর একটি হলো, তাঁর বর্তমান সাক্ষ্যের সঙ্গে পূর্বে দেওয়া কোনো প্রাসঙ্গিক বক্তব্যের অসংগতি প্রতিষ্ঠা করা। কোনো সাক্ষী আদালতে এক ধরনের বক্তব্য দিলেন, অথচ পূর্বে লিখিত কোনো বক্তব্যে এমন কথা বলেছিলেন যা বর্তমান বক্তব্যের সঙ্গে মেলে না। যদি সেই অসংগতি প্রাসঙ্গিক ও আইনগতভাবে প্রমাণযোগ্য হয়, তাহলে তা সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা দুর্বল করতে পারে। ধরা যাক, একটি হত্যামামলায় সাক্ষী আদালতে বললেন, তিনি রাত ১০টায় ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে অভিযুক্তকে আঘাত করতে দেখেছেন। কিন্তু তাঁর পূর্ববর্তী লিখিত বক্তব্যে তিনি এমন তথ্য দিয়েছিলেন, যা থেকে বোঝা যায়, ওই সময়ে তাঁর ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার কথা নয়। এই দুই বক্তব্যের মধ্যে প্রকৃত ও গুরুত্বপূর্ণ বিরোধ থাকলে তা সাক্ষীর বক্তব্যের নির্ভরযোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।

ধারা ১৪৫ অনুযায়ী সঠিক পদ্ধতি

১৪৫ ধারার মূল উদ্দেশ্য হলো, সাক্ষীর পূর্ববর্তী লিখিত বক্তব্যের সঙ্গে বর্তমান সাক্ষ্যের বিরোধ থাকলে তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠা করা। এর দুটি দিক রয়েছে।

  • প্রথমত, সাক্ষীকে তাঁর পূর্ববর্তী লিখিত বক্তব্য সম্পর্কে জেরা করা যায়। এ পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট লেখাটি প্রথমেই তাঁর সামনে উপস্থাপন করা বা প্রমাণ করা সব ক্ষেত্রে আবশ্যক নয়।
  • দ্বিতীয়ত, সাক্ষীকে ওই লেখার মাধ্যমে সরাসরি বিরোধিতা করতে চাইলে, লেখাটি প্রমাণ করার আগে যে অংশের ওপর নির্ভর করা হবে, সেই অংশের প্রতি সাক্ষীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে। এরপর আইনানুগ পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট বক্তব্য প্রমাণের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

 

জেরার মাধ্যমে সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা পরীক্ষা

প্রাসঙ্গিক বিধান: সাক্ষ্য আইনের ১৪৬ ধারা।

জেরা (Cross-Examination) কেবল সাক্ষীর বক্তব্য পুনরাবৃত্তি করানোর প্রক্রিয়া নয়। এর মাধ্যমে সাক্ষীর বক্তব্যের সত্যতা, ব্যক্তিগত জ্ঞান, পর্যবেক্ষণক্ষমতা, নিরপেক্ষতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা পরীক্ষা করা হয়।

১৪৬ ধারায় এমন প্রশ্ন করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যেগুলো—

  • সাক্ষীর সত্যবাদিতা যাচাই করে;
  • সাক্ষীর পরিচয় ও সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে তথ্য উদ্ঘাটন করে;
  • সাক্ষীর চরিত্র সম্পর্কিত প্রাসঙ্গিক তথ্যের মাধ্যমে তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করতে সহায়তা করে।

 ধরা যাক, কোনো সাক্ষী দাবি করলেন যে, তিনি একটি ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন। জেরায় তাঁকে প্রশ্ন করা যেতে পারে, ঘটনার সময় তিনি কোথায় ছিলেন, সেখান থেকে কত দূরত্বে দাঁড়িয়ে ছিলেন, আলো পর্যাপ্ত ছিল কি না এবং কতক্ষণ ঘটনাটি দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। এসব প্রশ্নের মাধ্যমে আদালত বুঝতে পারবেন, সাক্ষীর দাবির বাস্তব ভিত্তি কতটা দৃঢ়।

একইভাবে, সাক্ষীর সঙ্গে কোনো পক্ষের আর্থিক লেনদেন, নিকট আত্মীয়তা, ব্যক্তিগত বিরোধ বা বিশেষ স্বার্থের সম্পর্ক থাকলে তা তাঁর নিরপেক্ষতা নির্ধারণের জন্য প্রাসঙ্গিক হতে পারে। তবে জেরার উদ্দেশ্য সাক্ষীকে বিব্রত করা বা অপমান করা নয়। সাক্ষীর চরিত্রসম্পর্কিত কোনো প্রশ্ন মামলার সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত, তা যুক্তিসংগতভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হওয়া উচিত।

 

নিজ পক্ষের সাক্ষীকে বৈরী ঘোষণা বা জেরা

প্রাসঙ্গিক বিধান: সাক্ষ্য আইনের ১৫৪ ধারা।

সাধারণত যে পক্ষ কোনো সাক্ষীকে আদালতে হাজির করে, সে পক্ষ আশা করে যে সাক্ষী তার বক্তব্যকে সমর্থন করবেন। কিন্তু সাক্ষী যদি সেই পক্ষের প্রত্যাশার বিপরীত বক্তব্য দেন, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অস্বীকার করেন অথবা এমন আচরণ করেন যা তাঁর বক্তব্যের নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি করে, তখন ওই পক্ষের পক্ষে সাক্ষীর বক্তব্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন হতে পারে।

১৫৪ ধারায় আদালতকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যাতে আদালত তার বিবেচনায় সাক্ষীকে হাজিরকারী পক্ষকে প্রতিপক্ষের জেরার মতো প্রশ্ন করার অনুমতি দিতে পারেন। প্রচলিত ভাষায় এ পরিস্থিতিতে সাক্ষীকে ‘বৈরী সাক্ষী’ (Hostile Witness) বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ, কোনো বাদী তাঁর মামলার পক্ষে একজন প্রত্যক্ষদর্শীকে হাজির করলেন। কিন্তু ওই সাক্ষী আদালতে এসে আগের বক্তব্য অস্বীকার করলেন। বাদী তখন আদালতের অনুমতি চেয়ে ওই সাক্ষীকে জেরা করতে পারেন এবং তাঁর পূর্ববর্তী বক্তব্যের সঙ্গে বর্তমান বক্তব্যের অসংগতি তুলে ধরতে পারেন। এ ক্ষেত্রে দুটি বিষয় মনে রাখা জরুরি।

  • প্রথমত, কোনো সাক্ষী প্রতিকূল বক্তব্য দিলেই আদালতকে অবশ্যই তাঁকে বৈরী সাক্ষী হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, এমন নয়। ১৫৪ ধারায় আদালতের বিবেচনামূলক ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে।
  • দ্বিতীয়ত, বৈরী সাক্ষী হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ফলে তাঁর সাক্ষ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পূর্ণ বাতিল হয়ে যায় না। তাঁর বক্তব্যের যে অংশ নির্ভরযোগ্য এবং অন্য প্রমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, আদালত সেই অংশ গ্রহণ করতে পারেন।

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট Khujji v. State of Madhya Pradesh মামলায় বৈরী সাক্ষীর সাক্ষ্য মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এই নীতির সমর্থন করেছে। মামলাটি বাংলাদেশের বাধ্যতামূলক নজির নয়; তবে সাক্ষ্য আইনের একই উৎসভিত্তিক বিধান ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে এটি তুলনামূলকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

 সাক্ষীর নিরপেক্ষতা ও পক্ষপাতিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ করা

সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা কেবল তাঁর চরিত্র বা অতীত বক্তব্য দিয়ে যাচাই করা হয় না। তাঁর কোনো পক্ষের প্রতি পক্ষপাত, আর্থিক স্বার্থ, ব্যক্তিগত শত্রুতা বা পারিবারিক বিরোধ রয়েছে কি না, সেটিও প্রাসঙ্গিক হতে পারে। যেমন, কোনো সাক্ষী অভিযুক্তের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধে জড়িত, অথবা মামলার ফলাফলে তাঁর প্রত্যক্ষ আর্থিক লাভ-ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। এ ধরনের তথ্য তাঁর বক্তব্যকে সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়নের প্রয়োজন সৃষ্টি করতে পারে। সাক্ষ্য আইনের ১৪৬ ধারা এ ধরনের প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের সুযোগ দেয়। এ ছাড়া ১৫৩ ধারার দ্বিতীয় ব্যতিক্রমে সাক্ষীর নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করার মতো বিষয় অস্বীকার করলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তাঁকে বিরোধিতা করার সুযোগ রাখা হয়েছে।  তবে আত্মীয়তা, পরিচিতি বা কোনো পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অর্থই সাক্ষী অবিশ্বাসযোগ্য নন। সম্পর্কের প্রকৃতি, সাক্ষ্য দেওয়ার কারণ এবং অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে তাঁর বক্তব্যের সামঞ্জস্য বিচার করে আদালত সিদ্ধান্ত নেবেন।

 সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা অভিশংসনের ক্ষেত্রে বিচারিক নজির

ক. Tahsildar Singh v. State of Uttar Pradesh, AIR 1959 SC 1012

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এই মামলায় পূর্ববর্তী বক্তব্যের মাধ্যমে সাক্ষীকে বিরোধিতা করার পদ্ধতি এবং গুরুত্বপূর্ণ বাদ পড়া বক্তব্যের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আদালতের আলোচনার মূল শিক্ষা হলো, কোনো বক্তব্যে তথ্য বাদ পড়েছে বলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বর্তমান সাক্ষ্যের বিরোধিতা করে না। বাদ পড়া তথ্যটি এমন হতে হবে, যার সঙ্গে বর্তমান বক্তব্যের প্রকৃত অসংগতি রয়েছে বা যা পূর্ববর্তী বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে বর্তমান সাক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না।

 খ. State of U.P. v. Ramesh Prasad Misra, (1996) 10 SCC 360

এ মামলায় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বৈরী সাক্ষীর সাক্ষ্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ নীতি ব্যাখ্যা করেছে। আদালতের বক্তব্যের সারকথা হলো, সাক্ষী বৈরী হিসেবে বিবেচিত হলেই তাঁর সম্পূর্ণ সাক্ষ্য উপেক্ষা করা যায় না। যে অংশ নির্ভরযোগ্য এবং অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা বিচারিক মূল্যায়নে বিবেচিত হতে পারে।

  গ. Birbal Nath v. State of Rajasthan, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট, ৩০ অক্টোবর ২০২৩

এ মামলায় আদালত পূর্ববর্তী বক্তব্য ও আদালতের সাক্ষ্যের মধ্যে পার্থক্য বিচার করার সময় সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। শুধু বক্তব্যে অসংগতি পাওয়া গেলেই একজন সাক্ষীর সম্পূর্ণ সাক্ষ্য বাতিল করা যথার্থ নয়। অসংগতিটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সাক্ষীর বক্তব্যের কোন অংশকে প্রভাবিত করে এবং অন্য প্রমাণ কী নির্দেশ করে, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। মামলাটিতে আদালত এ কথাও স্পষ্ট করেছে যে, কোনো অসংগতি সাক্ষ্যের একটি নির্দিষ্ট অংশের বিশ্বাসযোগ্যতাকে দুর্বল করলেও তা অবশিষ্ট সব বক্তব্যকে অবিশ্বাস্য করে তুলতে হবে, এমন কোনো সাধারণ নিয়ম নেই।

 বিশ্বাসযোগ্যতা অভিশংসনের ক্ষেত্রে আইনগত সীমাবদ্ধতা

সাক্ষ্য আইন সাক্ষীকে জেরা করার সুযোগ দিলেও এই সুযোগ সীমাহীন নয়। সাক্ষীর চরিত্র সম্পর্কে প্রশ্ন করার অধিকার এবং তাঁকে অপমান করার অধিকার এক বিষয় নয়।

ধারা ১৪৮: মামলার মূল বিষয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কহীন, কেবল সাক্ষীর চরিত্রের মাধ্যমে তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রভাবিত করতে পারে এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে সাক্ষীকে বাধ্য করা হবে কি না, তা আদালত নির্ধারণ করবেন। প্রশ্নের অভিযোগ সত্য হলে সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর তার সম্ভাব্য প্রভাব, অভিযোগটি কতটা পুরোনো বা দূরবর্তী এবং সাক্ষ্যের গুরুত্বের সঙ্গে অভিযোগের গুরুত্বের অনুপাত আদালত বিবেচনা করবেন।

ধারা ১৪৯: যুক্তিসংগত ভিত্তি ছাড়া সাক্ষীকে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না।

ধারা ১৫০: যুক্তিসংগত ভিত্তি ছাড়া কোনো আইনজীবী প্রশ্ন করেছেন বলে আদালত মনে করলে, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে তাঁর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট পেশাগত কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠাতে পারেন।

ধারা ১৫১: অশ্লীল বা কেলেঙ্কারিমূলক প্রশ্ন আদালত নিষিদ্ধ করতে পারেন, যদি না তা মামলার বিতর্কিত বিষয় নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় হয়।

ধারা ১৫২: সাক্ষীকে অপমান বা বিরক্ত করার উদ্দেশ্যে করা প্রশ্ন কিংবা অপ্রয়োজনীয়ভাবে আপত্তিকর ভাষায় উত্থাপিত প্রশ্ন আদালত নিষিদ্ধ করবেন।

ধারা ১৫৩: কেবল সাক্ষীর চরিত্র ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে করা প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার পর সাধারণ নিয়মে সেই উত্তরকে খণ্ডন করার জন্য নতুন প্রমাণ দেওয়া যায় না। তবে সাক্ষী পূর্ববর্তী কোনো অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার বিষয় অস্বীকার করলে, প্রথম ব্যতিক্রম অনুসারে তাঁর পূর্ববর্তী দণ্ডের প্রমাণ দেওয়া যেতে পারে। সাক্ষীর নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রশ্নে তিনি সংশ্লিষ্ট তথ্য অস্বীকার করলে, দ্বিতীয় ব্যতিক্রম অনুযায়ী তাঁকে বিরোধিতা করার সুযোগও রয়েছে।

এই বিধানগুলো থেকে বোঝা যায়, জেরা হবে যুক্তিনির্ভর, প্রাসঙ্গিক এবং বিচারিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সাক্ষীকে হেয় করা, তাঁর ব্যক্তিগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা বা ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা আইনসম্মত জেরার উদ্দেশ্য নয়।

উপসংহার

সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা অভিশংসন বিচারপ্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর মাধ্যমে আদালত সাক্ষীর বক্তব্যের সত্যতা, নিরপেক্ষতা ও নির্ভরযোগ্যতা পরীক্ষা করার সুযোগ পান। বাংলাদেশের সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ ধারা এ উদ্দেশ্যে তিনটি প্রধান পদ্ধতি নির্ধারণ করেছে—বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে অন্যান্য সাক্ষীর সাক্ষ্য, ঘুষ বা দুর্নীতিমূলক প্রলোভনের প্রমাণ এবং পূর্ববর্তী অসংগত বক্তব্যের প্রমাণ। এর সঙ্গে ১৪৫, ১৪৬ ও ১৫৪ ধারার বিধানও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।

তবে কোনো সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া এবং তাঁর সম্পূর্ণ সাক্ষ্য অগ্রহণযোগ্য হয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়। আদালতকে প্রমাণের সামগ্রিক মূল্যায়ন করতে হয়। তাই দক্ষ আইনজীবীর কাজ কেবল সাক্ষীর বক্তব্যে অসংগতি খুঁজে বের করা নয়; বরং সেই অসংগতির আইনগত গুরুত্ব যথাযথ পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠা করা।

Post a Comment

0 Comments