প্রশ্ন: ক) অপরাধ আমলে আনা বলতে কী বোঝেন? ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক অপরাধ বিচারার্থে আমলে আনার পদ্ধতিগুলো কী কী? খ) নালিশ কাকে বলে? কোন ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেট নালিশ খারিজ করে দেবেন?
উত্তর:
ক) অপরাধ আমলে আনা
অপরাধ আমলে নেওয়া (cognizance) মানে আদালত কর্তৃক কোনো অপরাধকে বিচারের
উদ্দেশ্যে গ্রহণ করা। অপরাধ ঘটলে থানায় বা আদালতে অভিযোগ করা যায়। থানায় অভিযোগ
করা হলে সেটি আমলে নেওয়ার উপযুক্ত ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠাতে হয়। অভিযোগ হাতে
পাওয়ার পর ম্যাজিস্ট্রেট তা বিচারের জন্য গ্রহণ করতে পারেন, আবার খারিজ বা ফেরতও
দিতে পারেন। গ্রহণ করে মামলার পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করলেই বলা হয়, অপরাধ আমলে
নেওয়া হয়েছে। একে মামলার প্রথম ধাপও বলা হয়। এ পর্যায়ে আদালত আনুষ্ঠানিক
সাক্ষ্যপ্রমাণ গ্রহণ করেন না।
আমল গ্রহণের অর্থ নিয়ে আদালতের ব্যাখ্যা আছে। Superintendent and
Remembrancer of Legal Affairs v. Abani Kumar Banerjee, AIR 1950 Cal 437 মামলায়
কলকাতা হাইকোর্ট বলেছে, ম্যাজিস্ট্রেট যখন কোনো অপরাধের অভিযোগে তার পরবর্তী
বিধানগুলো অনুযায়ী কার্যক্রম শুরুর উদ্দেশ্যে বিষয়টিতে মন দেন (applies his
mind), তখনই আমল গ্রহণ হয়। শুধু অভিযোগ হাতে পাওয়া বা পুলিশকে তদন্তের নির্দেশ
দেওয়ার সঙ্গে এর পার্থক্য আছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট R. R. Chari v. State of
U.P., AIR 1951 SC 207 মামলায় এই ব্যাখ্যা অনুমোদন করে। আরও একটি জরুরি কথা হলো,
ম্যাজিস্ট্রেট অপরাধের আমল গ্রহণ করেন, ব্যক্তির নয়। Raghubans Dubey v. State of
Bihar, AIR 1967 SC 1167 মামলায় বলা হয়েছে, একবার অপরাধের আমল গ্রহণ হলে প্রকৃত
অপরাধীদের শনাক্ত করা ও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া আদালতের দায়িত্ব, অভিযোগে
যাদের নাম আছে শুধু তাদের বিরুদ্ধে নয়।
ম্যাজিস্ট্রেট
কর্তৃক অপরাধ আমলে আনার পদ্ধতি
ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ১৯০ এ আমলে নেওয়ার পদ্ধতি বলা হয়েছে। এই
ধারা অনুযায়ী চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, চিফ
জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট এবং এ বিষয়ে বিশেষভাবে
ক্ষমতাপ্রাপ্ত অন্য ম্যাজিস্ট্রেট নিচের তিনটি উপায়ে অপরাধ আমলে নিতে পারেন।
- এক, অপরাধ সংঘটিত হয় এমন ঘটনা সম্পর্কে নালিশ পেয়ে (ধারা ১৯০(১)(ক))। নালিশ কী, তা পরে আলোচনা করা হয়েছে।
- দুই, কোনো পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে একই ঘটনার লিখিত রিপোর্ট পেয়ে (ধারা ১৯০(১)(খ))। আমলযোগ্য অপরাধের প্রাথমিক তথ্য পেয়ে থানার কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে যান এবং তদন্ত করেন। তদন্তের পর পাওয়া সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে তিনি ধারা ১৭৩ অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে একটি পুলিশ রিপোর্ট দেন। এই রিপোর্ট দুই ধরনের হতে পারে: ফাইনাল রিপোর্ট এবং চার্জশিট। চার্জশিটে অপরাধের প্রমাণ পাওয়ার কথা বলা হয়, ফাইনাল রিপোর্টে বলা হয় প্রমাণ পাওয়া যায়নি। Bhagwant Singh v. Commissioner of Police, (1985) 2 SCC 537 মামলায় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, পুলিশ ফাইনাল রিপোর্ট দিলে ম্যাজিস্ট্রেট তা মেনে নিতে পারেন। আবার তিনি রিপোর্টের সঙ্গে একমত না হয়ে আমল গ্রহণ করতে পারেন, কিংবা আরও তদন্তের নির্দেশ দিতে পারেন। রিপোর্ট মেনে নেওয়ার আগে তথ্যদাতাকে নোটিশ দিয়ে শুনতে হয়।
- তিন, পুলিশ কর্মকর্তা ছাড়া অন্য কারও কাছ থেকে খবর পেয়ে, অথবা নিজের জানা বা সন্দেহের ভিত্তিতে (ধারা ১৯০(১)(গ))। এ ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেট নিজের উদ্যোগেও আমল নিতে পারেন।
খ) নালিশ
ফৌজদারি কার্যবিধিতে নালিশের সংজ্ঞা দেওয়া আছে (বইয়ে ধারা ৪(জ), অর্থাৎ
৪(১)(এইচ) বোঝানো হয়েছে বলে আমার ধারণা)। সেই সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো পরিচিত বা
অপরিচিত ব্যক্তি একটি অপরাধ করেছে, এই মর্মে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে কার্যবিধি
অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্দেশ্যে মৌখিক বা লিখিতভাবে করা অভিযোগকে নালিশ বলে।
পুলিশ কর্মকর্তার রিপোর্ট নালিশের অন্তর্ভুক্ত নয়।
কোনো ব্যক্তি, বাদী বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি অপরাধ আমলে নিতে পারে এমন আদালতে
হাজির হয়ে অভিযোগ করলে ম্যাজিস্ট্রেট সেটি আমলে নেন। বাদী বা সংবাদদাতা প্রকাশ্য
আদালতে হাজির হয়ে অভিযোগ দায়ের করলে মামলাটি নালিশি মামলা বা সি.আর. মামলা
হিসেবে চলে। সাধারণত থানা কোনো কারণে মামলা নিতে না চাইলে নালিশের মাধ্যমে সরাসরি
আদালতে অভিযোগ দায়ের করা যায়।
কোন ক্ষেত্রে
ম্যাজিস্ট্রেট নালিশ খারিজ করবেন
ধারা ২০৩ অনুযায়ী, যে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নালিশ করা হয়েছে বা যার কাছে
তা হস্তান্তর করা হয়েছে, তিনি ফরিয়াদির শপথপূর্বক জবানবন্দি (ধারা ২০০) এবং
অনুসন্ধান বা তদন্তের ফলাফল (ধারা ২০২) বিবেচনা করবেন। এগুলো বিবেচনার পরও যদি
দেখেন যে মামলায় এগোনোর মতো পর্যাপ্ত কারণ নেই, তাহলে সংক্ষেপে কারণ লিখে নালিশ
খারিজ করবেন। নালিশ খারিজ হলে আসামিরা অব্যাহতি পান।
কোন কোন ক্ষেত্রে খারিজ করা যায়, তার একটি পরিষ্কার ধারণা Smt. Nagawwa v.
Veeranna Shivalingappa Konjalgi, AIR 1976 SC 1947 মামলায় পাওয়া যায়। সুপ্রিম
কোর্ট বলেছে, নালিশের অভিযোগ যদি যেমন আছে তেমন ধরে নিলেও কোনো অপরাধ গঠন না করে,
অভিযোগ যদি অসম্ভব বা অযৌক্তিক হয়, নালিশে ও ফরিয়াদির জবানবন্দিতে কোনো অপরাধের
উপাদান না থাকে, অথবা নালিশ হয়রানির উদ্দেশ্যে করা মনে হয়, তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট
নালিশ খারিজ করতে পারেন। কিন্তু এ পর্যায়ে সাক্ষ্য ওজন করে মামলার সত্যাসত্য
নির্ধারণ করা ম্যাজিস্ট্রেটের কাজ নয়। Chandra Deo Singh v. Prokash Chandra
Bose, AIR 1963 SC 1430 মামলায়ও বলা হয়েছে, ধারা ২০২-এর অনুসন্ধানে দেখার বিষয়
হলো আসামির বিরুদ্ধে এগোনোর মতো প্রাথমিক ভিত্তি আছে কি না।
এ ছাড়া অন্য কিছু ক্ষেত্রেও নালিশ খারিজ হতে পারে। যেমন ফরিয়াদি প্রসেস ফি
না দিলে ধারা ২০৪ অনুযায়ী, কিংবা নির্ধারিত দিনে ফরিয়াদি অনুপস্থিত থাকলে ধারা
২৪৭ অনুযায়ী।
ধারা ২০৩ অনুযায়ী খারিজ হলে ফরিয়াদির পথ একেবারে বন্ধ হয়ে যায় না।
Pramatha Nath Talukdar v. Saroj Ranjan Sarkar, AIR 1962 SC 876 মামলায় সুপ্রিম
কোর্ট বলেছে, ধারা ২০৩-এর খারিজ আদেশ একই ঘটনায় নতুন নালিশের বাধা নয়, তবে তা
কেবল ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে সম্ভব। যেমন আগের আদেশ অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে
হয়ে থাকলে, বা নালিশের প্রকৃতি ভুল বোঝা হয়ে থাকলে, অথবা নতুন তথ্য এমন হলে যা
যথাযথ যত্ন নিয়েও আগে আনা যেত না।
আসামির ব্যক্তিগত
হাজিরা পরিহার
ধারা ২০৫(১) অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেট সমন জারি করার সময় যুক্তিসংগত কারণ
থাকলে আসামিকে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে রেহাই দিতে পারেন এবং আইনজীবীর মাধ্যমে
উপস্থিত হওয়ার অনুমতি দিতে পারেন। তবে ধারা ২০৫(২) অনুযায়ী তদন্ত বা বিচারাধীন
ম্যাজিস্ট্রেট নিজের বিবেচনায় মামলার যেকোনো পর্যায়ে আসামিকে ব্যক্তিগতভাবে
হাজির হতে নির্দেশ দিতে পারেন এবং প্রয়োজনে হাজির হতে বাধ্যও করতে পারেন।
উপসংহার: সুতরাং বলা
যায়, ম্যাজিস্ট্রেট নালিশ, পুলিশ রিপোর্ট অথবা নিজের জানা বা অন্য কারও দেওয়া
খবরের ভিত্তিতে অপরাধ আমলে নিতে পারেন। নালিশের ক্ষেত্রে তিনি প্রথমে ফরিয়াদিকে
শপথ করিয়ে পরীক্ষা করেন, আর শেষ পর্যন্ত এগোনোর মতো কারণ না পেলে ধারা ২০৩
অনুযায়ী খারিজ করেন।

0 Comments