সর্বশেষ

6/recent/ticker-posts

"জন্মগত অপরাধী” (Born Criminal)

 

“জন্মগত

“জন্মগত অপরাধী” (Born Criminal) ধারণাটি অপরাধতত্ত্বের ইতিহাসে একটি আলোচিত ও বিতর্কিত তত্ত্ব, যা প্রথম সুসংগঠিতভাবে উপস্থাপন করেন ইতালীয় অপরাধতাত্ত্বিক । উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে তার বিখ্যাত গ্রন্থ -এ তিনি যুক্তি দেন যে কিছু মানুষ জন্মগতভাবেই অপরাধপ্রবণ এবং তাদের অপরাধপ্রবণতা জৈবিকভাবে নির্ধারিত। লোমব্রোসো মূলত “positivist school of criminology”-এর অগ্রদূত, যেখানে অপরাধকে শুধুমাত্র আইনগত বা নৈতিক বিচ্যুতি হিসেবে নয়, বরং বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়।

লোমব্রোসোর মতে, “born criminal” হলো এমন এক ব্যক্তি যার মধ্যে আদিম মানুষের বৈশিষ্ট্যের পুনরাবির্ভাব ঘটে, যাকে তিনি “atavism” হিসেবে চিহ্নিত করেন। তার ধারণা ছিল, মানব বিবর্তনের ধারায় কিছু ব্যক্তি পিছিয়ে পড়ে এবং তাদের মধ্যে প্রাচীন বা আদিম প্রবৃত্তি রয়ে যায়, যা তাদেরকে সহিংসতা, চুরি বা অন্যান্য অপরাধের দিকে ধাবিত করে। এই তত্ত্ব অনুসারে, অপরাধী হওয়া কোনো সামাজিক শিক্ষার ফল নয়; বরং এটি একটি জৈবিক বৈশিষ্ট্য যা জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই নির্ধারিত।

লোমব্রোসো অপরাধীদের শারীরিক গঠন বিশ্লেষণ করে কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেন, যা তার মতে “stigmata” বা অপরাধের চিহ্ন। এর মধ্যে রয়েছে অস্বাভাবিক বড় চোয়াল, চ্যাপ্টা নাক, লম্বা বাহু, অসমান দাঁত, অতিরিক্ত বড় কান, বা খুলি ও মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক গঠন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে এসব শারীরিক বৈশিষ্ট্য একজন ব্যক্তির অপরাধপ্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। এভাবে তিনি অপরাধকে একটি জৈবিক ও শারীরিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন। তার গবেষণায় তিনি হাজার হাজার অপরাধীর দেহ পরীক্ষা করেন এবং সেগুলোর ভিত্তিতে তার তত্ত্ব নির্মাণ করেন।

তিনি অপরাধীদের বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করেন—যেমন born criminal, insane criminal, occasional criminal, habitual criminal ইত্যাদি। এর মধ্যে “born criminal” শ্রেণিটি সবচেয়ে গুরুতর এবং বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচিত, কারণ তাদের অপরাধপ্রবণতা স্থায়ী ও প্রাকৃতিক বলে ধরা হয়। এই শ্রেণিবিভাগ অপরাধবিজ্ঞানে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি করে, যেখানে অপরাধীদের আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা হয়।

তবে এই তত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি “deterministic” বা পূর্বনির্ধারণমূলক। অর্থাৎ, যদি কেউ জন্মগতভাবে অপরাধী হয়, তবে তার পক্ষে অপরাধ থেকে বিরত থাকা প্রায় অসম্ভব। এই ধারণা আইন ও ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সংঘর্ষ সৃষ্টি করে, কারণ এটি ব্যক্তিগত দায়িত্ব ও নৈতিক পছন্দের ধারণাকে দুর্বল করে দেয়। যদি অপরাধ জন্মগত হয়, তবে শাস্তির ন্যায্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

আধুনিক এই তত্ত্বকে আর গ্রহণ করে না। কারণ, পরবর্তীকালে গবেষণায় দেখা গেছে যে অপরাধ একটি বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া, যেখানে জৈবিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং সামাজিক সব উপাদানই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উদাহরণস্বরূপ, -এর Differential Association Theory দেখায় যে অপরাধমূলক আচরণ শেখা যায় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে। একইভাবে -এর Strain Theory অনুযায়ী, সামাজিক চাপ ও সুযোগের অভাব মানুষকে অপরাধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

এছাড়া আধুনিক জীববিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের গবেষণায়ও দেখা গেছে যে কোনো নির্দিষ্ট শারীরিক বৈশিষ্ট্য অপরাধপ্রবণতার নির্ভরযোগ্য সূচক নয়। যদিও কিছু ক্ষেত্রে জেনেটিক প্রবণতা বা মস্তিষ্কের গঠন আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে, তবে তা একমাত্র কারণ নয়। পরিবেশ, পরিবার, শিক্ষা, অর্থনৈতিক অবস্থা, এবং সামাজিক মূল্যবোধ—সবকিছু মিলেই একজন ব্যক্তির আচরণ গঠন করে।

লোমব্রোসোর তত্ত্বের আরেকটি বড় সমালোচনা হলো এটি বৈজ্ঞানিকভাবে দুর্বল এবং পক্ষপাতদুষ্ট। তার গবেষণায় তুলনামূলক বিশ্লেষণের অভাব ছিল এবং তিনি প্রায়ই পূর্বধারণা নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতেন। অনেক ক্ষেত্রে তিনি যে শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে অপরাধের চিহ্ন হিসেবে দেখিয়েছেন, সেগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যেও পাওয়া যায়। ফলে তার তত্ত্ব বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকেও “born criminal” ধারণাটি সমস্যাজনক। এটি একজন ব্যক্তিকে জন্মগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে বিচার করার প্রবণতা তৈরি করে, যা বৈষম্য ও অন্যায়ের জন্ম দিতে পারে। আধুনিক আইনব্যবস্থা ব্যক্তিগত দায়িত্ব, ন্যায়বিচার, এবং সমানাধিকারের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কাজের জন্য বিচার করা হয়, জন্মগত বৈশিষ্ট্যের জন্য নয়।

তবে সব সমালোচনা সত্ত্বেও, লোমব্রোসোর অবদান অপরাধতত্ত্বে অস্বীকার করা যায় না। তিনি প্রথমবারের মতো অপরাধকে বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণের চেষ্টা করেন এবং অপরাধীদের নিয়ে প্রায়োগিক গবেষণার সূচনা করেন। তার কাজ পরবর্তীকালে আরও উন্নত ও সমন্বিত তত্ত্ব বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আজকের দিনে অপরাধবিজ্ঞান একটি আন্তঃবিষয়ক ক্ষেত্র হিসেবে বিকশিত হয়েছে, যেখানে আইন, সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, এবং জীববিজ্ঞানের সমন্বয়ে অপরাধকে বোঝার চেষ্টা করা হয়।

সবশেষে বলা যায়, “জন্মগত অপরাধী” তত্ত্বটি অপরাধতত্ত্বের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও এটি বর্তমান সময়ে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণযোগ্য নয়। এটি আমাদের শিখিয়েছে যে অপরাধকে বোঝার জন্য কেবল একটি কারণের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়; বরং মানুষের আচরণকে একটি জটিল ও বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিশ্লেষণ করতে হয়।

রেফারেন্স:
১. Lombroso: L'Uomo Delinquente
২। Edwin H. Sutherland: Principles of Criminology.
৩. Robert K. Merton: Social Structure and Anomie
৪. Larry J. Siegel: Criminology: The Core
৫. P. Williams III & Marilyn D. McShane: Criminological Theory


Post a Comment

0 Comments